টাওয়ার ছাড়াই মুঠোফোনে যোগাযোগের বাণিজ্যিক অনুমোদন চায় বাংলালিংক

· Prothom Alo

দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, চর, দ্বীপ কিংবা সাগরে থাকা মানুষকে মুঠোফোন নেটওয়ার্কের আওতায় আনতে পরীক্ষামূলকভাবে ‘ডিরেক্ট-টু-সেল’ (ডিটুসি) সেবা চালু করেছিল বাংলালিংক। এ কার্যক্রম সফল হয়েছে দাবি করে স্যাটেলাইটভিত্তিক এই সেবা এবার বাণিজ্যিকভাবে চালু করতে চায় অপারেটরটি। এ জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) কাছে আবেদন করেছে বাংলালিংক।

Visit aportal.club for more information.

স্টারলিংকের সঙ্গে অংশীদারত্বে এ সেবা চালাবে বাংলালিংক। অনুমোদন পেলে শুরুতে এসএমএস ও লাইট ডেটা সেবা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পরবর্তী সময়ে ভয়েস ও ডেটা সেবা বাড়ানোর সুযোগ থাকবে।

তবে দেশের সব অঞ্চলে মোবাইল নেটওয়ার্ক পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, চর, দ্বীপ, উপকূল ও গভীর সমুদ্রে স্থলভিত্তিক নেটওয়ার্ক অবকাঠামো তৈরি করা কঠিন। এসব এলাকায় নতুন টাওয়ার স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচও তুলনামূলক বেশি।

যেভাবে কাজ করে ডিটুসি

সাধারণ মুঠোফোনের যোগাযোগব্যবস্থা মূলত ভূমিতে স্থাপিত মোবাইল টাওয়ারের ওপর নির্ভরশীল। ফোন থেকে পাঠানো সংকেত প্রথমে কাছের মোবাইল টাওয়ারে যায়। কিন্তু কোনো এলাকায় টাওয়ার না থাকলে বা দুর্যোগে টাওয়ার অচল হয়ে গেলে মুঠোফোনে নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না।

ডিরেক্ট-টু-সেল প্রযুক্তিতে মুঠোফোনের সংকেত সরাসরি মহাকাশে থাকা স্যাটেলাইটে পৌঁছায়। স্যাটেলাইট সেই সংকেত গ্রাউন্ড স্টেশনে পাঠায়। এরপর সেটি সংশ্লিষ্ট মোবাইল অপারেটরের নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বার্তা বা ডেটা আদান-প্রদানের সুযোগ তৈরি করে। এ প্রযুক্তির বড় সুবিধা হলো, সেবা পেতে আলাদা স্যাটেলাইট ফোন বা বিশেষ কোনো যন্ত্রের প্রয়োজন হয় না।

প্রযুক্তিগতভাবে উপযোগী সাধারণ ফোর–জি মুঠোফোন ব্যবহার করেই সেবা নেওয়া সম্ভব। মোবাইল টাওয়ারের কভারেজের বাইরে গেলে ফোনটি স্যাটেলাইটের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা করবে।

কোনো এলাকায় টাওয়ার না থাকলে বা দুর্যোগে টাওয়ার অচল হয়ে গেলে মুঠোফোনে নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না।

কেন দরকার

বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, দেশের চারটি মোবাইল অপারেটরের মোট মুঠোফোন গ্রাহক ১৯ কোটির কাছাকাছি। মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার করেন প্রায় ১২ কোটি গ্রাহক। অপারেটরগুলোর নিজস্ব টাওয়ার রয়েছে ২১ হাজার ৩৬৯টি। এর বাইরে সাত হাজারের বেশি টাওয়ার ভাগাভাগি করে ব্যবহার করা হচ্ছে।

তবে দেশের সব অঞ্চলে মোবাইল নেটওয়ার্ক পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, চর, দ্বীপ, উপকূল ও গভীর সমুদ্রে স্থলভিত্তিক নেটওয়ার্ক অবকাঠামো তৈরি করা কঠিন। এসব এলাকায় নতুন টাওয়ার স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচও তুলনামূলক বেশি। ফলে কম জনসংখ্যার বা দুর্গম এলাকায় টাওয়ার স্থাপনে অপারেটরদের আগ্রহ কম থাকে।

ডিরেক্ট-টু-সেল প্রযুক্তি সেই সীমাবদ্ধতা কিছুটা কমানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে। যেখানে টাওয়ার স্থাপন করা কঠিন, সেখানে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সাধারণ মুঠোফোনে সীমিত যোগাযোগসেবা দেওয়া সম্ভব হবে।

বাংলালিংক বলছে, পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে বিটিআরসি, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি ও নিরাপত্তা সংস্থার কর্মকর্তাদের সামনে ডিরেক্ট-টু-সেল সেবার প্রদর্শনী করেছে।

পরীক্ষামূলক কার্যক্রম

চলতি বছরের এপ্রিল মাসে স্টারলিংকের মাধ্যমে ডিরেক্ট-টু-সেল সেবা পরীক্ষার জন্য বিটিআরসির অনুমতি চেয়েছিল বাংলালিংক। গত মে মাসে সরকার দুই মাসের প্রুফ অব কনসেপ্ট (পিওসি) পরীক্ষার অনুমতি দেয়। পরীক্ষার উদ্দেশ্য ছিল প্রচলিত মোবাইল টাওয়ারের বাইরে থাকা এলাকায় স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সাধারণ মুঠোফোনে মোবাইল সংযোগ দেওয়া কতটা কার্যকর, তা যাচাই করা। পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের সময় বান্দরবান, সন্দ্বীপসহ নেটওয়ার্ক কভারেজের বাইরে থাকা এলাকায় প্রযুক্তিটি পরীক্ষা করা হয়।

বাংলালিংক বলছে, পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে বিটিআরসি, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি ও নিরাপত্তা সংস্থার কর্মকর্তাদের সামনে ডিরেক্ট-টু-সেল সেবার প্রদর্শনী করেছে বাংলালিংক। প্রতিষ্ঠানটির সাম্প্রতিক তথ্যমতে, সেখানে এসএমএস, ওটিটি-ভিত্তিক মেসেজিং, ওটিটি ভয়েস কলসহ বিভিন্ন কার্যকারিতা দেখানো হয়েছে।

বাংলালিংকের চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স অফিসার তৈমুর রহমান সফলভাবে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শেষ করার পর আমরা এখন প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক অনুমোদনের অপেক্ষায় আছি। অনুমোদন পাওয়া গেলে বাণিজ্যিকভাবে এই উদ্ভাবনী প্রযুক্তি চালু করা সম্ভব হবে

বাণিজ্যিক অনুমোদন চেয়ে চিঠি

পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শেষ করার পর স্টারলিংকের সঙ্গে অংশীদারত্বে সেবাটি বাণিজ্যিকভাবে চালুর অনুমোদন চেয়ে সম্প্রতি বিটিআরসিকে চিঠি দিয়েছে বাংলালিংক। চিঠিতে বলা হয়েছে, প্রচলিত এলটিই-সক্ষম মুঠোফোন কোনো বাড়তি যন্ত্র ছাড়াই সরাসরি ডিটুসি সেবায় যুক্ত হতে পারে—পিওসিতে তা প্রমাণিত হয়েছে। এই ভিত্তিতে বিদ্যমান সেলুলার মোবাইল সার্ভিসেস অপারেটর লাইসেন্সের আওতায় প্রাথমিকভাবে এসএমএস ও লাইট ডেটা সেবা দিয়ে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরুর অনুমতি চেয়েছে তারা।

চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় সাধারণ মোবাইল টাওয়ার বা ফাইবার নেটওয়ার্ক ক্ষতিগ্রস্ত হলে ডিটুসি বিকল্প যোগাযোগমাধ্যম হিসেবে কাজ করতে পারে। এ ছাড়া গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া জেলে ও অন্য সামুদ্রিক পেশাজীবীরা, যাঁরা বর্তমানে স্থলভিত্তিক মোবাইল নেটওয়ার্কের কভারেজের বাইরে থাকেন, তাঁরাও এর মাধ্যমে সংযুক্ত থাকার সুযোগ পাবেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাংলালিংক আরও জানিয়েছে, সেবা চালুর ক্ষেত্রে কমিশনের নির্ধারিত সব শর্ত ও নির্দেশনা মেনে চলতে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

জানতে চাইলে বাংলালিংকের চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স অফিসার তৈমুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্টারলিংকের ডিরেক্ট-টু-সেল প্রযুক্তি দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের যোগাযোগব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। সফলভাবে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শেষ করার পর আমরা এখন প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক অনুমোদনের অপেক্ষায় আছি। অনুমোদন পাওয়া গেলে বাণিজ্যিকভাবে এই উদ্ভাবনী প্রযুক্তি চালু করা সম্ভব হবে।’

স্টারলিংকের সঙ্গে অংশীদারত্বে এ সেবা চালাবে বাংলালিংক। অনুমোদন পেলে শুরুতে এসএমএস ও লাইট ডেটা সেবা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পরবর্তী সময়ে ভয়েস ও ডেটা সেবা বাড়ানোর সুযোগ থাকবে।

শুরুতে যে সেবা মিলবে

বাংলালিংক সূত্র বলছে, বাণিজ্যিক অনুমোদন পেলে প্রথম পর্যায়ে এসএমএস ও ওটিটি মেসেজিং চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। পরবর্তী ধাপে ভয়েস ও ডেটা সেবা যুক্ত হতে পারে। অর্থাৎ শুরুতেই সাধারণ মোবাইল ইন্টারনেটের মতো উচ্চগতির ইন্টারনেট পাওয়া যাবে—এমনটি ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। ডিরেক্ট-টু-সেলের বর্তমান ব্যবহারে মূল সুবিধা হলো, প্রচলিত মোবাইল নেটওয়ার্কের বাইরে থাকা অবস্থায়ও সীমিত ব্যান্ডউইথে যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করা।

নিয়ন্ত্রক অনুমোদনে প্রশ্ন

পরীক্ষামূলক কার্যক্রম সফল হওয়ার পরও বাণিজ্যিক সেবা চালুর আগে নিয়ন্ত্রক অনুমোদনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বিটিআরসি বাংলালিংককে যে অনুমতি দিয়েছিল, তা ছিল শুধু পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের জন্য। সেই অনুমোদনকে ভবিষ্যতের বাণিজ্যিক অনুমোদনের নিশ্চয়তা হিসেবে ধরা যাবে না—এমন শর্তও ছিল।

এর বাইরে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও ডিরেক্ট-টু-সেল সেবার জন্য ব্যবহৃত স্পেকট্রাম নিয়ে আলোচনা চলছে। আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের (আইটিইউ) আওতায় মুঠোফোন সেবার জন্য নির্ধারিত আইএমটি ব্যান্ড স্যাটেলাইটের মাধ্যমে মোবাইল সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে কীভাবে ব্যবহার করা হবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সিদ্ধান্ত এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ২০২৭ সালের ওয়ার্ল্ড রেডিওকমিউনিকেশন কনফারেন্সে (ডব্লিউআরসি) এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা রয়েছে।

বাংলাদেশের নিজস্ব নিয়ন্ত্রক কাঠামোতেও এ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিটিআরসির এনজিএসও (নন-জিওস্টেশনারি অরবিট) স্যাটেলাইট সার্ভিসের গাইডলাইনে এই লাইসেন্সের আওতায় ‘স্যাটেলাইট ও স্থলভিত্তিক আইএমটি সেবা’ দেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। আইএমটি বলতে মূলত মুঠোফোন সেবার জন্য ব্যবহৃত প্রযুক্তি ও স্পেকট্রামকে বোঝায়।

যদিও বিটিআরসির একটি সূত্র বলছে, ডিটুসি প্রযুক্তির বিষয়টি কমিশন ইতিবাচকভাবে ভাবছে।

বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব) এমদাদ উল বারী প্রথম আলোকে বলেন, ডিরেক্ট-টু-সেল প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের প্রতিবেদন এখনো কমিশনের হাতে আসেনি। প্রতিবেদন পাওয়ার পর এ বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

Read full story at source