ঝন্টু ভাইয়ের নীতিশিক্ষা

· Prothom Alo

আমরা থাকি সরকারি কোয়ার্টার্সে। সেখানে বিশাল মাঠ। ফুটবল আর ভলিবল খেলা হয়। মজমপুর পূর্বাচল ক্লাবের ছেলেরা খেলতে আসে। তারা সবাই প্রফেশনাল খেলোয়াড়। তাই তাদের প্রতি আমাদের আগ্রহ এবং শ্রদ্ধা অসীম।

তখন আমি ইশকুলে ক্লাস সিক্সে পড়ি। মানুষের জীবনে এমন কিছু শিক্ষক আসেন, যাঁদের নাম কোনো পাঠ্যবইয়ে লেখা থাকে না, তবে তাঁদের শিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী হয়। আমার জীবনে তেমন একজন শিক্ষক ছিলেন আমাদের ঝন্টু ভাই। পূর্বাচল ক্লাবের সদস্য। আমাদের মাঠে খেলতে আসতেন।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

ঝন্টু ভাইয়ের শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া কঠিন। এ বিষয়ে পাড়ায় অন্তত চারটা মতবাদ প্রচলিত ছিল। প্রথম দল বলত, ঝন্টু ভাই ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়েছেন। দ্বিতীয় দল বলত, ক্লাস নাইন। তৃতীয় দল দাবি করত, তিনি এতবার ফেল করেছিলেন যে শেষ পর্যন্ত ক্লাসের সঙ্গে তাঁর একধরনের আত্মীয়তা তৈরি হয়েছিল। আর চতুর্থ দল, যারা সংখ্যায় কম হলেও বিশ্বাসে অটল ছিল, তারা মনে করত ঝন্টু ভাই আসলে শিক্ষাব্যবস্থার অনেক ঊর্ধ্বে উঠে গিয়েছিলেন।

ঝন্টু ভাই নিজে অবশ্য এ বিতর্কে জড়াতেন না। তিনি বলতেন, ‘আমি পড়াশোনা ছাড়িনি। পড়াশোনাই আমাকে হারিয়ে ফেলেছে।’

কথাটা আমরা বুঝতাম না। কিন্তু বুঝতে না পারাটাই সম্ভবত কথাটার সৌন্দর্য ছিল।

পড়াশোনা করে কোনো লাভ নেই—এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে ঝন্টু ভাই দীর্ঘ গবেষণা করেছিলেন। গবেষণার ফলাফলও তিনি আমাদের মাঝেমধ্যে জানাতেন।

‘দেখো,’ তিনি বলতেন, ‘ক্লাসের ফার্স্ট বয় বড় হয়ে চাকরি খোঁজে। আর যে স্কুলে ঠিকমতো যেত না, সে ব্যবসা করে ফার্স্ট বয়কে চাকরি দেয়। কাজেই বেশি পড়াশোনার মধ্যে খানিক আর্থিক অনিশ্চয়তা আছে।’

আমি তখন ক্লাস সিক্সের ছাত্র। অর্থনীতি সম্পর্কে আমার জ্ঞান ছিল টিফিনের টাকা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। ফলে ঝন্টু ভাইয়ের যুক্তির দুর্বলতা ধরার মতো বুদ্ধি আমার ছিল না। তা ছাড়া তিনি এমন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলতেন যে মাঝে মাঝে মনে হতো, পৃথিবীর সব ভুল তথ্য যদি সঠিক ভঙ্গিতে বলা যায়, তাহলে সেগুলোও সত্য হয়ে উঠতে পারে।

পড়াশোনা থেকে অবসর নেওয়ার পর ঝন্টু ভাই মানবকল্যাণে আত্মনিয়োগ করলেন। তাঁর প্রধান কাজ ছিল ছোটদের উপদেশ দেওয়া। সকালবেলা চায়ের দোকানে, দুপুরে মোড়ের মাথায়, বিকেলে মাঠের পাশে এবং সন্ধ্যায় ফার্মেসির বেঞ্চে বসে তিনি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতেন।

আমি ছিলাম তাঁর সবচেয়ে নিয়মিত ছাত্র। এটা জ্ঞানের প্রতি আমার অদম্য আকর্ষণের কারণে নয়। প্রকৃত কারণ হলো, ঝন্টু ভাই আমাকে দেখলেই ডাকতেন। আর তাঁর ডাক উপেক্ষা করার সাহস আমার ছিল না।

দ্বিতীয় শিক্ষা ছিল টাইম ম্যানেজমেন্ট। ঝন্টু ভাই বললেন, ‘কখনো সময় নষ্ট করবি না।’ খেয়াল করলাম, কথাটা বলার সময় তিনি প্রায় এক ঘণ্টা ধরে চায়ের দোকানে বসে আছেন। ঘটনা তাঁকে বললাম। তিনি বললেন, ‘এটা সময় নষ্ট নয়। এটা হচ্ছে সময় পর্যবেক্ষণ। কাজের প্রস্তুতি।’

একদিন স্কুল থেকে ফিরছি। কাঁধে ব্যাগ, হাতে অঙ্কের খাতা, মাথায় পরীক্ষার দুশ্চিন্তা। এমন সময় চায়ের দোকান থেকে ঝন্টু ভাই ডাকলেন।

‘এই, এদিকে আয়।’

আমি এগিয়ে গেলাম।

ঝন্টু ভাই কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, ‘জীবনে বড় হতে চাইস?’

আমি বললাম, ‘জি, চাই।’

তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘এটাই তোর প্রথম ভুল।’

আমি হতবাক হয়ে বললাম, ‘কেন?’

ঝন্টু ভাই বললেন, ‘কারণ, সবাই বড় হতে চায়। তাই সবাই একই লাইনে দাঁড়ায়। জীবনে আলাদা হতে হলে তোকে আলাদা কিছু চাইতে হয়।’

জানতে চাইলাম, ‘আলাদা কিছু মানে কী?’

ঝন্টু ভাই কিছুক্ষণ ভেবে বললেন, ‘সেটা এখনো আবিষ্কার করিনি।’

সেদিন বুঝলাম, বড় চিন্তাবিদদের কাছে সব প্রশ্নের উত্তর থাকে না। কিছু প্রশ্ন তাঁরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে যান।

তবে আমার ওই বয়সে এটা খেয়াল করেছি, ঝন্টু ভাইয়ের শিক্ষা ছিল বাস্তবমুখী। তিনি বিশ্বাস করতেন, বইয়ের জ্ঞান মানুষকে পরীক্ষায় পাস করাতে পারে, কিন্তু জীবনে সফল করতে পারে না। জীবনের জন্য প্রয়োজন অভিজ্ঞতা। আর অভিজ্ঞতা বলতে তিনি বুঝতেন—অন্যের অভিজ্ঞতা শুনে নিজের অভিজ্ঞতা বলে চালিয়ে দেওয়া।

একদিন আমাকে ডেকে বললেন, ‘বুঝলি দীপু, জীবনে বড় হতে হলে তিনটা জিনিস শিখতে হবে—কথা বলা, কথা ঘোরানো আর প্রয়োজনে আগের কথা অস্বীকার করা।’

অবাক হয়ে বললাম, ‘তাহলে সত্য কথা?’

ঝন্টু ভাই দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘সত্য কথা অবশ্যই বলবি। তবে এমন সত্য বলবি, যাতে তোর কোনো ক্ষতি না হয়। সত্যেরও নিরাপদ সংস্করণ আছে।’

সেদিনই বুঝলাম, আমি একজন অসাধারণ শিক্ষকের সান্নিধ্যে আছি। এরপর শুরু হলো আমার নীতিশিক্ষা। ঝন্টু ভাই বললেন, ‘প্রথম শিক্ষা—বড়দের সম্মান করবি। কারণ, বড়রা সম্মান পেলে খুশি হয়। খুশি হলে তাঁরা উপদেশ দেন। আর উপদেশ দিলে তুই নিজের কাজ করতে পারবি।’

তিনি ব্যাখ্যা করে বললেন, ‘বড়দের সঙ্গে কখনো আর্গুমেন্টে যাবি না। কারণ, আর্গুমেন্টে জিতলেও লাভ নেই। বড়রা শেষ পর্যন্ত বলবে, তুই এখনো ছোট। ফলে এত পরিশ্রম করে অর্জিত বিজয় মুহূর্তে বাতিল হয়ে যাবে।’

দ্বিতীয় শিক্ষা ছিল টাইম ম্যানেজমেন্ট। ঝন্টু ভাই বললেন, ‘কখনো সময় নষ্ট করবি না।’

খেয়াল করলাম, কথাটা বলার সময় তিনি প্রায় এক ঘণ্টা ধরে চায়ের দোকানে বসে আছেন। ঘটনা তাঁকে বললাম। তিনি বললেন, ‘এটা সময় নষ্ট নয়। এটা হচ্ছে সময় পর্যবেক্ষণ। কাজের প্রস্তুতি।’

আর তখনই বুঝি, পৃথিবীতে নীতিশিক্ষকের অভাব নেই, অভাব শুধু সেই সব শিক্ষকের, যাঁরা নিজেদের নিয়েও হাসতে পারেন। ঝন্টু ভাই অন্তত সেই বিরল শ্রেণির মানুষ। তিনি অন্যদের যেমন উপদেশ দেন, নিজের আচরণ দিয়েও প্রমাণ করেন যে মানুষ মূলত যুক্তির প্রাণী নয়, মানুষ হলো নিজের সুবিধাকে যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করার প্রাণী। এই মহান উপলব্ধির জন্য আমি আজও ঝন্টু ভাইয়ের কৃতজ্ঞ ছাত্র।

ঝন্টু ভাইয়ের মতে, পৃথিবীর অধিকাংশ সফল মানুষ কাজ করার আগে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ না করে কাটিয়েছেন। কারণ, তাঁরা প্রস্তুতি নিয়েছেন। আর প্রস্তুতি দেখতে অনেক সময় অলসতার মতো লাগে।

তৃতীয় শিক্ষা ছিল সত্যবাদিতা, ‘সব সময় সত্য বলবি।’

খুশি হলাম। কিন্তু তক্ষুনি তিনি যোগ করলেন, ‘তবে মনে রাখবি, সত্য বলার আগে চিন্তা করে দেখবি সত্যটা শোনার জন্য শ্রোতা প্রস্তুত কি না।’

জিজ্ঞেস করলাম, ‘যদি প্রস্তুত না থাকে?’

ঝন্টু ভাই বললেন, ‘তাহলে অপেক্ষা করবি। মানুষকে সত্য বলারও মৌসুম আছে।’

এই পর্যায়ে এসে বুঝতে শুরু করলাম, সত্যবাদিতা আদতে মৌসুমি ব্যাপার।

তারপর শেখালেন, ‘পরিশ্রমের বিকল্প নেই।’

বলে আমাকে দিয়ে নিজের চা আনালেন। চা খেতে খেতে বললেন, ‘দেখলি? তোকে পরিশ্রমের সুযোগ দিলাম। একজন ভালো শিক্ষক সব সময় ছাত্রকে বিকশিত হওয়ার সুযোগ দেয়।’

এভাবেই দিন যেতে থাকল। ঝন্টু ভাইয়ের কাছে প্রতিদিন নতুন নতুন জ্ঞান লাভ করতাম।

আজ বহু বছর পরে বুঝতে পারি, ঝন্টু ভাই মানুষকে নিয়ে গভীর সত্য আবিষ্কার করেছিলেন। আমরা সবাই নীতির কথা বলি, কিন্তু নীতির প্রয়োগে ছাড় চাই। আমরা সবাই সত্যকে ভালোবাসি, কিন্তু নিজের বিরুদ্ধে গেলে সত্যকে একটু পরে শুনতে চাই। আমরা সবাই পরিশ্রমের প্রশংসা করি, তবে সুযোগ পেলে অন্য কাউকে দিয়ে কাজটা করিয়ে নিতে আপত্তি করি না। ঝন্টু ভাইয়ের শিক্ষা তাই কোনো বইয়ের শিক্ষা ছিল না। ছিল মানুষের শিক্ষা।

আজও যখন কোনো সভায় কেউ দীর্ঘ নৈতিক বক্তৃতা দেয়, আমি ঝন্টু ভাইকে মনে করি। মনে হয়, তিনি পাশে বসে চা খেতে খেতে বলছেন, ‘কথাগুলো খারাপ নারে। এখন শুধু দেখার বিষয়, বক্তা নিজে এগুলো মানে কি না।’

আর তখনই বুঝি, পৃথিবীতে নীতিশিক্ষকের অভাব নেই, অভাব শুধু সেই সব শিক্ষকের, যাঁরা নিজেদের নিয়েও হাসতে পারেন।

ঝন্টু ভাই অন্তত সেই বিরল শ্রেণির মানুষ। তিনি অন্যদের যেমন উপদেশ দেন, নিজের আচরণ দিয়েও প্রমাণ করেন যে মানুষ মূলত যুক্তির প্রাণী নয়, মানুষ হলো নিজের সুবিধাকে যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করার প্রাণী।

এই মহান উপলব্ধির জন্য আমি আজও ঝন্টু ভাইয়ের কৃতজ্ঞ ছাত্র।

Read full story at source