আমরা ব্যর্থতা থেকেই শিখেছি: সৈয়দ জুবায়ের হাসান
· Prothom Alo

তরুণ উদ্যোক্তাদের হাত ধরেই তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন ব্যবসা ও সম্ভাবনার গল্প। তবে একটি উদ্যোগ শুরু করা থেকে সেটিকে টিকিয়ে রাখা ও এগিয়ে নেওয়ার পথ সহজ নয়। নানা চ্যালেঞ্জ, সিদ্ধান্ত ও শেখার অভিজ্ঞতা পেরিয়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা কীভাবে গড়ে তুলছেন নিজেদের স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান—সেই সব গল্প নিয়েই প্রথম আলো ডটকম ও প্রাইম ব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে বিশেষ পডকাস্ট শো ‘লিগ্যাসি উইথ এমআরএইচ: সিজন-৩’। এই পর্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ রিদওয়ানুল হকের সঞ্চালনায় অতিথি ছিলেন কৃষিভিত্তিক উদ্যোগ ‘কৃষি স্বপ্ন’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ জুবায়ের হাসান।
কৃষকেরা কখনোই তাঁদের পণ্যের ন্যায্য বা সর্বোচ্চ মূল্য পান না। একজন কৃষক যদি সারা বছর কৃষিকাজ করে ৩০ হাজার টাকা আয় করেন, অথচ শহরে এসে রিকশা চালিয়ে মাসে একই পরিমাণ অর্থ আয় করতে পারেন, তাহলে কৃষিকে তিনি কেন লাভজনক পেশা হিসেবে দেখবেন? ‘কৃষি স্বপ্নের’ লক্ষ্য শুধু ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা নয়, কৃষক যেন তাঁর পণ্যের সর্বোচ্চ সম্ভাব্য মূল্য পান, সেটিও নিশ্চিত করা।
পডকাস্ট শোতে অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন সৈয়দ জুবায়ের হাসান। কৃষকদের উৎপাদন থেকে পণ্য বাজারজাত পর্যন্ত নানা সমস্যার অভিজ্ঞতা থেকেই কৃষি নিয়ে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানান তিনি। পর্বটি প্রচারিত হয় গতকাল শনিবার প্রথম আলোর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে।
Visit saltysenoritaaz.com for more information.
পডকাস্টের শুরুতেই সঞ্চালক জানতে চান, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে কম্পিউটার সায়েন্স নিয়ে পড়াশোনা করেও কৃষিকে পেশাগতভাবে বেছে নেওয়ার কারণ কী?
সৈয়দ জুবায়ের হাসানের উত্তর, ‘আমার যাত্রা শুরু হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই। এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ ছিল আমার চারপাশের পরিবেশ। আমার পরিবারের অন্যতম প্রধান ব্যবসা ছিল কৃষিভিত্তিক। ছোটবেলা থেকেই কৃষি ও কৃষকদের খুব কাছ থেকে দেখেছি। তখন থেকেই একটি বিষয় লক্ষ করতাম, কৃষকেরা তাঁদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম পান না।’
২০১৯ সালকে নিজের উদ্যোক্তা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে উল্লেখ করে সৈয়দ জুবায়ের বলেন, ‘ওই সময় নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে কম্পিউটার সায়েন্স নিয়ে পড়ছিলাম। কৃষি খাতের সমস্যাকে আমি শুধু সংকট হিসেবে দেখিনি, বরং এর মধ্যে ব্যবসার নতুন সম্ভাবনাও দেখতে পেয়েছিলাম।’
প্রসঙ্গক্রমে সঞ্চালক জানতে চান, কৃষিকাজ করতে গিয়ে কৃষকদের মূল সমস্যাটি ঠিক কোথায়?
সৈয়দ জুবায়ের হাসান বলেন, বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ সরাসরি কৃষির সঙ্গে যুক্ত। কৃষকেরা চার থেকে ছয় মাস পর একটি ফসল উৎপাদন করেন। কিন্তু সেই ফসল বাজারে নেওয়ার পর এর দাম নির্ধারণের ক্ষমতা অনেক সময় তাঁদের হাতে থাকে না। স্থানীয় বাজারের সংগ্রাহক বা মধ্যস্বত্বভোগীরাই অনেক ক্ষেত্রে দাম নির্ধারণ করেন। এর ফলে কৃষক নিজের উৎপাদনের যথাযথ মূল্য পান না। দীর্ঘ সময় ও শ্রম দিয়ে উৎপাদন করার পরও যখন কাঙ্ক্ষিত আয় হয় না, তখন কৃষকের পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মও কৃষির প্রতি আগ্রহ হারাতে শুরু করে।
এ প্রসঙ্গে মাঠপর্যায়ের একটি অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে সৈয়দ জুবায়ের হাসান বলেন, ২০২০ সালে প্রায় এক হাজার কৃষকের তথ্য নিয়ে কাজ করার পর কৃষকদের একটি অংশের সঙ্গে পরবর্তী সময়ে আবার যোগাযোগ করা হয়। তখন দেখা যায়, কয়েক মাস ধরে ফসল উৎপাদন করে একজন কৃষক যে পরিমাণ আয় করছেন, সেটি তাঁর বার্ষিক আয় হিসাবে যথেষ্ট নয়। তাহলে কৃষি কেন তাঁর কাছে আকর্ষণীয় হবে?
প্রযুক্তি নিয়ে পড়াশোনার অভিজ্ঞতা থেকেই কৃষির সমস্যার সমাধানে প্রযুক্তি ব্যবহারের চিন্তা আসে সৈয়দ জুবায়ের হাসানের। এ প্রসঙ্গ উল্লেখ করে সঞ্চালক জানতে চান, কীভাবে ব্লকচেইন প্রযুক্তিকে কৃষির সঙ্গে যুক্ত করলেন?
সৈয়দ জুবায়ের হাসান বলেন, ‘২০১৯ সালে যখন আমরা শুরু করি, তখন আমাদের একটি ন্যূনতম কার্যকর পণ্য তৈরি করতে হয়েছিল। কৃষির একটি সরবরাহব্যবস্থায় তিন থেকে চার ধরনের অংশীজন থাকে। তাঁদের তথ্য নিয়ে সরবরাহব্যবস্থার প্রতিটি ধাপ অনুসরণযোগ্য করার চেষ্টা করি আমরা। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় বন্ধু ও শিক্ষকদের সহযোগিতায় একটি ব্লকচেইনভিত্তিক মডেল তৈরি করাই আমরা। এর উদ্দেশ্য ছিল কৃষিপণ্যের সরবরাহব্যবস্থায় উৎপাদন থেকে বাজার পর্যন্ত তথ্যের স্বচ্ছতা ও অনুসরণযোগ্যতা নিশ্চিত করা। তবে শুরুতে একটি বাস্তব সমস্যার মুখোমুখি হই আমরা। প্রযুক্তিগতভাবে সমাধান তৈরি করলেও যাঁদের জন্য এটি তৈরি করা হয়েছিল, তাঁরা তখনো নতুন প্রযুক্তি গ্রহণের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত ছিলেন না।’
এ প্রসঙ্গে সঞ্চালক মন্তব্য করে বলেন, আপনারা হয়তো সময়ের চেয়ে কিছুটা এগিয়ে গিয়েছিলেন।’
‘হ্যাঁ। আমরা ব্যর্থ হয়েছিলাম। কারণ, সেই ব্যর্থতা থেকে আমরা অনেক কিছু শিখেছি। একটি প্রযুক্তিপণ্য তৈরি করাও একটি যাত্রা’, বলেন সৈয়দ জুবায়ের হাসান। তিনি আরও বলেন, যেকোনো প্রযুক্তিপণ্য তৈরির আগে যাঁদের জন্য সেটি তৈরি করা হচ্ছে, তাঁদের সমস্যা ও প্রয়োজন বুঝতে হবে। শুধু প্রযুক্তি তৈরি করলেই হবে না, ব্যবহারকারীর বাস্তব পরিস্থিতি বুঝে সমাধান তৈরি করতে হবে।
সঞ্চালক আরও জানতে চান, কৃষকদের দক্ষতা উন্নয়নে আপনাদের কাজ কীভাবে এগোচ্ছে?
সৈয়দ জুবায়ের হাসান বলেন, ‘আমরা কৃষকদের সঙ্গে মূলত দুই পর্যায়ে কাজ করি। ফসল কাটার আগের পর্যায়ে কৃষকদের কৃষি পরামর্শ, সার ও প্রয়োজনীয় সুপারিশ দিই। আর ফসল কাটার পরের পর্যায়ে তাঁদের বাজারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করার চেষ্টা করি। কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের মূল্য বাড়ানোর জন্য মোড়কজাতকরণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন ও সংরক্ষণ, বাছাই এবং শ্রেণিবিন্যাসের মতো বিষয়েও প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকি। আমরা যদি একজন কৃষককে বাজারদরের চেয়ে ৮-১০ টাকা বেশি দিতে পারি, সেটিই কৃষকের জন্য অনেক বড় বিষয় হতে পারে।’
কৃষি স্বপ্নের নেটওয়ার্কে ইতিমধ্যে ২০ হাজারের বেশি কৃষি উদ্যোক্তা যুক্ত হয়েছেন উল্লেখ করে সৈয়দ জুবায়ের বলেন, ‘তাঁদের ভালোভাবে মোড়কজাতকরণ, পণ্যের ভালো দাম পাওয়া এবং বাছাই ও শ্রেণিবিন্যাস করার বিষয়ে অবহিত করা হচ্ছে। পাশাপাশি বাজারসংযোগ তৈরির মাধ্যমে কৃষকের পণ্যের ভালো মূল্য নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। নারী-কৃষকদের নিয়েও আলাদাভাবে কাজ করছি আমরা।’
আলোচনায় নিজের উদ্যোক্তা জীবনের অর্জন নিয়েও কথা বলেন সৈয়দ জুবায়ের হাসান। সঞ্চালক জানতে চান, এখন পর্যন্ত কোন অর্জন তাঁকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করেছে?
সৈয়দ জুবায়ের হাসান জানান, বিভিন্ন স্বীকৃতি ও অর্জন তাঁদের কাজকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করেছে। তবে তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় অর্জন হলো তাঁর দল। ২০১৯ সালে যাত্রা শুরুর পর থেকে বন্ধু, পরিবার ও সহকর্মীদের নিয়ে একটি দল তৈরি হয়েছে। বর্তমানে তাঁদের দলে ১৯ জন সদস্য রয়েছেন। অনেক নতুন উদ্যোগ প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়ন ও অগ্রগতির দিকে বেশি গুরুত্ব দেয়। কিন্তু কৃষি স্বপ্নের ক্ষেত্রে শুরু থেকেই মানুষের জীবনে প্রভাব তৈরির বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা সব সময় চিন্তা করেছি, আমাদের অগ্রগতি হবে, প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়ন হবে, কিন্তু সেটা ইতিবাচক প্রভাব তৈরির মাধ্যমে। আমাদের কাছে অর্থের চেয়ে ইতিবাচক প্রভাব বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’
আলোচনার শেষ পর্যায়ে জলবায়ু পরিবর্তন ও কৃষির সম্পর্ক নিয়ে সঞ্চালক জানতে চান, এ বিষয়ে কৃষি স্বপ্ন কীভাবে কাজ করছে?
সৈয়দ জুবায়ের হাসান বলেন, ‘আমাদের মূল স্লোগান “কৃষি ও পরিবেশের জন্য উদ্ভাবন”। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শুধু কৃষক নয়, কৃষিপণ্যের সরবরাহব্যবস্থা ও পুরো মূল্যশৃঙ্খলই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বন্যা, আকস্মিক বন্যা, মৌসুমি বন্যা ও মাটির বিভিন্ন সমস্যার কারণে প্রতিবছর কৃষকেরা ক্ষতির মুখে পড়ছেন।’
এ পরিস্থিতিতে কৃষির সঙ্গে জলবায়ু তহবিল ও কার্বন ক্রেডিট যুক্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করেন সৈয়দ জুবায়ের হাসান। তাঁর মতে, কার্বন ক্রেডিটের বাধ্যতামূলক বাজার ও স্বেচ্ছাসেবী বাজার—দুই ক্ষেত্রেই কৃষকদের জন্য সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য মূল্য সংযোজিত বাধ্যতামূলক বাজার তৈরি করা গেলে উত্তম কৃষি পদ্ধতি, উন্নত কৃষি পদ্ধতি ও বাণিজ্যিক কৃষির মাধ্যমে তাঁদের অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ তৈরি হবে। এতে কৃষকদের জন্য আয়ের নতুন উৎস তৈরি হবে, তবে ভালো কৃষি পদ্ধতি অনুসরণে কৃষকদের উৎসাহিত করতে হলে এর বিনিময়ে কৃষকেরা কী সুবিধা পাবেন, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।