নওগাঁয় ব্যবসায়ীকে হত্যা : হামলার পর বলেছিলেন, ‘আমি ওদেরকে চিনি’

· Prothom Alo

নওগাঁর মহাদেবপুরে বাড়ির ফটকে দুর্বৃত্তদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে ব্যবসায়ী অলিপ চন্দ্র দত্ত (৫৫) গুরুতর আহত হন। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়।

Visit amunra-online.pl for more information.

পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, হামলার পর স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা ছিনতাই করেছে দুর্বৃত্তরা। তাঁরা জানান, অলিপ চন্দ্রের মৃত্যুর আগে দেওয়া বক্তব্য হত্যাকাণ্ডের তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারে। আহত অবস্থায় তিনি তাঁকে থানায় নিয়ে যাওয়ার কথা বলেছিলেন।

মহাদেবপুর উপজেলা সদরের দুলালপাড়া এলাকায় গত সোমবার রাত সাড়ে আটটার দিকে ব্যবসায়ী অলিপ দত্তের ওপর হামলা হয়। অলিপ দত্তের ছোট ভাই সুশান্ত কুমার দত্তের বাড়ির সঙ্গে লাগানো গলিতে এ ঘটনা ঘটে। উপজেলা সদরে তাঁর ‘দুলাল জুয়েলার্স’ নামের একটি সোনার দোকান আছে।

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, হামলাকারীদের অলিপ দত্ত চিনতে পেরেছিলেন। পূর্বপরিচিতদের মধ্যেই কেউ হত্যাকারী হতে পারে। থানায় গিয়ে তিনি হত্যাকারীর নাম বলতে চেয়েছিলেন। তবে থানায় নেওয়ার আগেই তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর স্ত্রী আদুরী রাণী বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে গতকাল মঙ্গলবার মহাদেবপুর থানায় মামলা করেছেন। হত্যাকাণ্ডে জড়িত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

হামলার পর প্রথম অলিপ দত্তকে আহত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখতে পান সুশান্ত কুমার। তিনি বলেন, ‘রাত আটটার দিকে আমার বাড়ির পাশেই দাদার ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। ওই সময় আমি বাড়িতেই আমার ঘরে ছিলাম। বাড়ির বাইরের দরজা খোলাই ছিল। বাইরে গোঙানির শব্দ পেয়ে বের হয়ে দেখি—আমার বাড়ি থেকে ১০-১২ মিটার দূরেই গলিতে উপুড় হয়ে একজন পড়ে আছে। এ সময় আমি দৌড়ে গিয়ে লোকটাকে তুলে দেখি, দাদা। ওই সময় দাদা আমাকে বলছিলেন, “আমাকে থানায় নিয়ে চল। আমি ওদেরকে চিনি।” এই কথা বলার পর দাদা আর কোনো কথা বলতে পারেননি। মারাত্মকভাবে আহত হওয়ায় আমরা প্রথমে চিন্তা করেছিলাম, আগে হাসপাতালে নিয়ে যাই। আগে চিকিৎসার ব্যবস্থা করি, তারপর থানায় যাব।’

অলিপ দত্তের ছবি হাতে তাঁর মেয়ে শীলা দত্ত

অলিপ দত্তের বড় মেয়ে শীলা দত্ত বলেন, ‘খুনি বাবার পূর্বপরিচিত কেউ হবে। বাবা থানায় গিয়ে ওদের নাম বলতে চেয়েছিল। হামলার কয়েক দিন আগে বাবা বাড়িতে বলেছিলেন, “দোকানে অপরিচিত লোকজন আসতেছে। কম বয়সী কয়েকটা ছেলে দোকানে স্বর্ণালংকার বিক্রি করতে এসেছিল। তাদের বলেছি, তোমাদের কাছ থেকে এসব জিনিস কেনা যাবে না। তোমরা ছোট; তোমাদের মা-বাবাকে নিয়ে আসো।” সম্ভবত ওরাই হত্যাকারী হতে পারে। অনেক দিন আগে থেকেই ওরা বাবার ওপর নজর রাখছিল হয়তো।’

শীলা দত্ত আরও বলেন, ‘বাবার ওপর হামলার কয়েক মিনিট আগে পাকা রাস্তার পাশে একটি বাড়ির সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, বাবার পেছন পেছন ২৫-২৬ বছর বয়সী সাদা শার্ট পরা একটা ছেলে আসতেছিল। সাদা শার্টের ভেতরে কালো গেঞ্জি পরেছিল ছেলেটা। বাবা পাকা রাস্তা থেকে আমাদের বাড়িতে যাওয়ার গলিপথে ঢোকার কিছুক্ষণ পর বাবার ব্যাগ হাতে ওই ছেলেকে দৌড়ে পালিয়ে যেতে দেখা যায়। তখন ওর গায়ে সাদা শার্ট ছিল না। কালো গেঞ্জি পরেছিল। বাবাকে যেখানে হামলা করা হয়, সেখান থেকে কয়েক মিনিট দূরে ধানখেত থেকে রক্তমাখা সাদা শার্ট ও চায়নিজ কুড়াল পেয়েছে পুলিশ।’

বাড়ির ফটকে ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যা, স্বর্ণালংকার-টাকা ছিনতাই

অলিপ দত্তকে কুপিয়ে তাঁর কাছে থাকা যে ব্যাগ ছিনিয়ে নেয় হত্যাকারীরা, তাতে প্রায় ছয় ভরি স্বর্ণালংকার ও সাত লাখ টাকা ছিল বলে স্বজনেরা জানিয়েছেন।

তবে ঘটনাটি শুধু ছিনতাইয়ের জন্য সংঘটিত, নাকি এর পেছনে ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক কোনো বিরোধ ছিল—এ প্রশ্নও সামনে এসেছে। স্বজন ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কিছুদিন আগে বাড়িতে চলাচলের রাস্তা নিয়ে ইউনুস নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে অলিপ দত্তের কথা-কাটাকাটি হয়। ইউনুস নামের ওই ব্যক্তি বাড়িতে চলাচলের রাস্তায় প্রাচীর তুলে বন্ধ করে দেওয়ায় বাড়ি থেকে অলিপ দত্তের মোটরসাইকেল নিয়ে চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে যায়। এর পর থেকে অলিপ ও তাঁর বাড়ির লোকজন হেঁটে চলাচল করতেন।

এই গলি পথে হামলার শিকার হন ব্যবসায়ী অলিপ দত্ত। বুধবার নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলা সদরের দুলালপাড়া এলাকায়

এ বিষয়ে মহাদেবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওমর ফারুক বলেন, সিসিটিভি ফুটেজ থেকে হত্যাকারীকে শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। প্রাথমিক তদন্তে মনে হয়েছে, অলিপ দত্তের গতিবিধি হত্যাকারীরা আগে থেকেই অনুসরণ করছিল। হত্যার দিন দোকান থেকে বের হওয়ার পর তাঁকে কেউ অনুসরণ করছিল। বাড়ির কাছাকাছি গলিপথটি নির্জন হওয়ায় ওত পেতে থাকা ব্যক্তিরা তাঁর ওপর হামলা চালায়। তাঁর কাছে স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা থাকার বিষয়টি হত্যাকারীরা আগে থেকেই জানত। এসব ছিনিয়ে নেওয়ার জন্যই এই হত্যাকাণ্ড হতে পারে।

তবে পূর্বশত্রুতার জেরে এই হত্যাকাণ্ড কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান ওসি ওমর ফারুক।

Read full story at source