গবেষণায় এআইয়ের অনৈতিক ব্যবহারে জালিয়াতির ঝুঁকি বাড়ছে

· Prothom Alo

গবেষণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। এআইয়ের অনৈতিক ব্যবহারে জাল গবেষণাপত্রের সংখ্যা বাড়ছে। ‘পেপার মিল’ (টাকার বিনিময়ে ভুয়া গবেষণাপত্র)–এর মতো কার্যক্রমও ধরা পড়ছে। ভুয়া ও মনগড়া পরিসংখ্যান এবং ভুল উদ্ধৃতির কারণে গবেষণার মান ও বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ছে। নতুন এই সংকট দূর করতে বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানে এআই নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।

ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির মাল্টিপারপাস হলে আজ বুধবার আয়োজিত ‘একাডেমিক অ্যান্ড রিসার্চ ইন্টেগ্রিটি কনক্লেভ ২০২৬’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে বক্তারা এ কথাগুলো বলেন। ‘এআই যুগে গবেষণায় নৈতিকতা, মান ও দায়িত্বশীল একাডেমিক চর্চা’ ছিল এবারের কনক্লেভের মূল আলোচ্য বিষয়। ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির আয়েশা আবেদ লাইব্রেরি এ আয়োজন করে। এতে জ্ঞান সহযোগী ছিল গবেষণায় সাদৃশ্য ও এআই-নির্ভর লেখা শনাক্তকরণ প্রতিষ্ঠান টার্নিটিন। অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক, গ্রন্থাগারিক, সম্পাদক, শিক্ষাবিদ ও নীতিনির্ধারকেরা অংশ নেন।

Visit newssport.cv for more information.

গবেষণায় সাদৃশ্য ও এআই লেখা শনাক্তকরণ প্রতিষ্ঠান টার্নিটিনের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক চৈতালি মিত্র বলেন, এআইয়ের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে গবেষণায় জালিয়াতির নতুন ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ‘পেপার মিল’ চক্র এআই ব্যবহার করে বিপুলসংখ্যক ভুয়া গবেষণাপত্র তৈরি করছে। ২০২০ সালের তুলনায় বর্তমানে গবেষণাপত্র প্রত্যাহারের হার প্রায় ৮০ গুণ বেড়েছে। ইউক্রেনকেন্দ্রিক একটি নেটওয়ার্ক থেকেই দেড় হাজারের বেশি জাল গবেষণাপত্রের সন্ধান পাওয়া গেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

চৈতালি মিত্র বলেন, এআই ভুয়া তথ্য, মনগড়া পরিসংখ্যান ও অস্তিত্বহীন উদ্ধৃতি তৈরি করতে পারে। এসব তথ্য অনেক সময় সাধারণ পর্যালোচনায় ধরা পড়ে না। ফলে ভুল তথ্য গবেষণায় ঢুকে পড়ছে। এআইয়ের তথ্যভান্ডারে থাকা প্রত্যাহৃত বা ভুল গবেষণাও পরবর্তী সময়ে আবার সঠিক তথ্য হিসেবে সামনে আসতে পারে। এতে ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে।

গবেষণায় সাদৃশ্য মানেই চৌর্যবৃত্তি নয় বলে উল্লেখ করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুল বাসিত। তিনি বলেন, ‘এআইয়ের যুগে চৌর্যবৃত্তি প্রতিরোধে আমাদের ভাবতে হবে। তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে অবশ্যই পেশাদারত্ব ও পক্ষপাতহীন থাকতে হবে।’

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান মামুন আহমেদ বলেন, এআইকে নিষিদ্ধ বা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তবে এর দায়িত্বশীল, নীতিগত ও স্বচ্ছ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন।

মামুন আহমেদ বলেন, কোন কাজ বা গবেষণায় এআই ব্যবহার করা যাবে, কোথায় যাবে না এবং কতটুকু ব্যবহার করা যাবে, তা নীতিমালায় স্পষ্ট থাকতে হবে। এআই কাজ দ্রুত করলেও ভুল তথ্য ও পক্ষপাত ছড়াতে পারে। তাই প্রযুক্তির ব্যবহারের চূড়ান্ত দায়ভার মানুষেরই।

গবেষণায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এআইয়ের ব্যবহার কতটা হয়েছে, সেটা ঘোষণা দেওয়ার পরামর্শ দেন ইউজিসি চেয়ারম্যান। এ ছাড়া শুধু এআই শনাক্তকারী সফটওয়্যারের ওপর নির্ভর না করে মৌখিক পরীক্ষা, গবেষণার খসড়া সংরক্ষণ ও বাস্তব সমস্যা সমাধানের মতো পদ্ধতি চালুর কথা বলেন তিনি।

ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্য রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, এআইকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু মূল প্রশ্ন হলো, কীভাবে এটি ব্যবহার করা হবে এবং কীভাবে নৈতিকতা ও গবেষণার মান বজায় রাখা হবে। রাশেদা কে চৌধূরীর মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পাশাপাশি মানুষের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অর্জিত জ্ঞানকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

এআই মানুষের বিকল্প নয়

এআইকে যাতে মানুষের বিকল্প ভাবা না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক এ এফ এম ইউসুফ হায়দার। তিনি বলেন, শুধু এআই শনাক্তকারী সফটওয়্যারের ওপর নির্ভর করাও ঠিক হবে না। একাডেমিক সততা নিশ্চিত করতে ভালো মূল্যায়ন পদ্ধতি, স্বচ্ছতা ও সততার সংস্কৃতি প্রয়োজন। এআই ভবিষ্যতে কম্পিউটার ও ইন্টারনেটের মতোই অপরিহার্য হয়ে উঠবে। তবে এটি যেন মানুষের চিন্তার বিকল্প না হয়, তা–ও নিশ্চিত করতে হবে।

প্রযুক্তিকে কতটা এবং কীভাবে ব্যবহার করা হবে, সে বিষয়ে ভাববার পরামর্শ দিয়ে এই অধ্যাপক বলেন, এআই দ্রুত ও সহজে কাজ করে বলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা এর ওপর নির্ভর করতে পারেন। কিন্তু অতিরিক্ত নির্ভরতা স্বাধীন চিন্তা, মৌলিকতা ও নতুন জ্ঞান তৈরির সক্ষমতাকে দুর্বল করতে পারে। তাই এআইকে নিষিদ্ধ বা শর্তহীনভাবে গ্রহণ—কোনোটিই সমাধান নয়।

ইউসুফ হায়দার বলেন, এআইকে সহায়ক ও শক্তিশালী বুদ্ধিবৃত্তিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। এটি মানুষের বিচারবোধ, সৃজনশীলতা ও গবেষণার বিকল্প হতে পারে না। উচ্চশিক্ষায় এআই ব্যবহারের জন্য ইউজিসির নেতৃত্বে জাতীয় কাঠামো তৈরির প্রস্তাব দেন তিনি।

ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির সহ-উপাচার্য অধ্যাপক আরশাদ মাহমুদ চৌধুরী এআইকে ভয় পাওয়ার পরিবর্তে সঠিক ও দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহারের পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, এআই শিক্ষা ও গবেষণায় নতুন সুযোগ তৈরি করছে। তবে মৌলিকতা, কর্তৃত্ব, গোপনীয়তা, মেধাস্বত্ব ও দায়িত্বের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও রয়েছে এখানে।

আরশাদ মাহমুদ বলেন, শুধু নীতিমালা করলেই হবে না। এর যথাযথ বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো, প্রশিক্ষণ এবং দায়িত্বশীলতার সংস্কৃতি প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণা ডেটাবেজ, ডিজিটাল অবকাঠামো ও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ব্যবহারেরও সুযোগ দিতে হবে। জাতীয় পর্যায়ে ইউজিসির এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে।

অনুষ্ঠানে ‘মানসম্মত শিক্ষার ভিত্তি হিসেবে একাডেমিক ও গবেষণার সততা’ বিষয়ে আলোচনা করেন ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের (ইউল্যাব) উপাচার্য অধ্যাপক শামসাদ মর্তুজা। ‘উচ্চশিক্ষায় একাডেমিক ও গবেষণার সততার জন্য জাতীয় কাঠামো’ বিষয়ে আলোচনা করেন ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের (আইইউবি) উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিম।

কার্নেগি মেলন ইউনিভার্সিটি লাইব্রেরির ডিজিটাল অবকাঠামো বিভাগের সহযোগী ডিন ও ওপেন সোর্স প্রোগ্রামস অফিসের পরিচালক সাইয়েদ চৌধুরী ‘উচ্চশিক্ষায় দায়িত্বশীল এআই ও একাডেমিক সততার ভবিষ্যৎ’ বিষয়ে বক্তব্য দেন।

ব্র্যাক জেমস পি গ্র্যান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথের অধ্যাপক কাওসার আফসানা জনস্বাস্থ্য, মানবিক সহায়তা ও নীতিনির্ভর গবেষণার অভিজ্ঞতার আলোকে গবেষণার সততা ও দায়িত্বশীল গবেষণা বিষয়ে বক্তব্য দেন।

ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ও প্রাতিষ্ঠানিক মান নিশ্চায়ন সেলের উপপরিচালক স্বাক্ষর শতাব্দী এআই যুগে মূল্যায়ন, শেখানো ও একাডেমিক সততা নতুনভাবে ভাবার বিষয়ে আলোচনা করেন।

ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির আয়েশা আবেদ লাইব্রেরির বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারিক হাসিনা আফরোজ একাডেমিক সততা রক্ষায় লাইব্রেরির ভূমিকা, এআই বিষয়ে জ্ঞান এবং দায়িত্বশীল গবেষণা নিয়ে আলোচনা করেন।

অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী অধিবেশন সঞ্চালনা করেন ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির যোগাযোগ বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ খায়রুল বাশার। পূর্ণাঙ্গ অধিবেশন সঞ্চালনা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ও সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এবং প্রক্টর রুবানা আহমেদ।

বক্তারা বলেন, এআই উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় বড় সুযোগ তৈরি করেছে। তবে এর সুফল পেতে হলে প্রযুক্তির সঙ্গে নৈতিকতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও মৌলিক চিন্তার সমন্বয় করতে হবে। এআইকে মানুষের চিন্তার বিকল্প না বানিয়ে মানুষের জ্ঞান ও সৃজনশীলতা বাড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ।

Read full story at source