তরুণেরা কেন উগ্রবাদের দিকে ঝুঁকে পড়েন

· Prothom Alo

উগ্রবাদে ঝুঁকে পড়ার প্রক্রিয়া কীভাবে শেষ পর্যন্ত সহিংস সন্ত্রাসবাদের দিকে নিয়ে যায়, সেই প্রশ্নে বৈশ্বিক পরিসরে গবেষকদের আগ্রহ কয়েক দশকজুড়ে ক্রমাগতভাবে বেড়ে চলেছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ভিন্ন হলেও তরুণদের মধ্যে এর নানাবিধ প্রভাব আমরা দেখতে পাই।

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে শহুরে তরুণদের সংশ্লিষ্টতার হার অনেক বেশি হওয়ার কারণে তাঁদের নিয়ে গবেষণার প্রতি মনোযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন হচ্ছে, তরুণদের মনোজগতে এমন কী পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যা তাঁদের উগ্রবাদী কার্যক্রমে উৎসাহিত করে?

Visit betsport.cv for more information.

উগ্রবাদের প্রভাব একজন মানুষের জীবনে খুব অল্প বয়স থেকে শুরু করে পরবর্তী যেকোনো পর্যায়ে ঘটতে পারে। উগ্রবাদকে বোঝার জন্য ব্যক্তির পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্নতার ধরনকে বোঝা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ব্যক্তি উগ্রবাদী ধারণার বাস্তবায়নের জন্য নিজেকে স্বপ্রণোদিতভাবে সমাজ ও পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।

আবার অনেক সময় পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্নভাবে জীবনযাপনকারী মানুষকে উগ্রবাদী গোষ্ঠী লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে তাদের উগ্র মতাদর্শের সংস্পর্শে নিয়ে আসার জন্য। এ প্রেক্ষাপটে সামাজিক পরিসরের বাইরেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও তরুণদের উগ্রপন্থায় আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। 

তরুণদের মধ্যে উগ্রবাদের ঝোঁক বোঝা কেন জরুরি

উগ্রবাদের প্রেক্ষাপটে বিচ্ছিন্নতা মূলত দুটি উপায়ে কাজ করে। প্রথমত, অনেক সময় ব্যক্তি হতাশা, বঞ্চনা বা মানসিক সংকটের কারণে পরিবার, বন্ধু এবং বৃহত্তর সমাজের সঙ্গে দৈনন্দিন যোগাযোগ ও সম্পর্ক থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয়।

এই বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি অনেকের জন্য এমন একটি ট্রিগার পয়েন্ট হিসেবে কাজ করে, যার ফলে তারা অনলাইন ও অফলাইনে বিভিন্ন উগ্রপন্থী প্রচারকের প্রতি আকৃষ্ট হতে পারে। দেখা গেছে, যারা চরম সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মধ্যে থাকে, তারা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ও সামাজিক পরিসরে সক্রিয় উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর সহজ লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠে।

সরকারের মধ্যে উগ্রবাদের উপস্থিতিকে অস্বীকার করার একটি প্রবণতাও দেখা যায়। কিন্তু সমাজে উগ্রবাদের উপস্থিতিকে অস্বীকার না করে একে নিয়ন্ত্রণ ও মোকাবিলা করার প্রক্রিয়াকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে

দ্বিতীয়ত, কোনো উগ্রবাদী গোষ্ঠী যখন ধীরে ধীরে একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে তাদের আদর্শ ও জীবনধারার দিকে প্রভাবিত ও উদ্বুদ্ধ করে, তখন তারা সচেতনভাবে সেই ব্যক্তিকে পরিবার ও সামাজিক পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করে।

পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেললে সেই ব্যক্তিকে সহজেই মতাদর্শগতভাবে প্রভাবিত করা বা ‘ব্রেনওয়াশ’ করা সম্ভব হয়। এভাবে প্রথমে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেওয়া হয়, পরে ধীরে ধীরে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলা হয় এবং সেই সম্পর্কের মাধ্যমে ব্যক্তিকে গোষ্ঠীর আদর্শের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয়।

ঢাকার বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু বোমা বা বোমাসদৃশ বস্তুর উপস্থিতির সংবাদ পাওয়া গিয়েছে।

এমন বিচ্ছিন্নতার প্রভাবে ব্যক্তির মনোজগতের বদলের পেছনে তাদের মধ্যকার আত্মপরিচয়ের সংকটও ভূমিকা রাখতে পারে। আত্মপরিচয়ের সংকট অনেক সময় মানুষকে একটি বৈশ্বিক ও একরূপী বা হোমোজেনাস ইসলামের ধারণার দিকে আকৃষ্ট করে।

এটা তাদেরকে বিশ্বব্যাপী মুসলিম উম্মাহর সঙ্গে একাত্মতাবোধের ধারণা দিয়ে থাকে। উদাহরণস্বরূপ ‘বাঙালিত্ব’ ও ‘মুসলমানিত্ব’ পরিচয়কেন্দ্রিক ধারণার টানাপোড়েনের সাম্প্রতিক বিতর্ককেও বলা যায়।

অনেক তরুণের মনে একই সঙ্গে ‘বাঙালি’ এবং ‘মুসলমান’ পরিচয় বহন করার প্রশ্নটি একটি জটিল ও অমীমাংসিত বিষয় হিসেবে রয়ে যায়। আবার অনেকের মধ্যে বাঙালি মুসলমান কিংবা বাংলাদেশি মুসলমানের পরিচয়ের দ্বিধাও দেখতে পাওয়া যায়। সাংস্কৃতিকভাবে এই দ্বিধাবিভক্ত অবস্থান অনেকের মধ্যে আত্মপরিচয়ের এক সংকট সৃষ্টি করে।

আত্মপরিচয়ের এমন সংকট বিশ্বব্যাপী বহু মুসলিম তরুণের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই ধারণা প্রবাসী মুসলিম সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হলেও বাংলাদেশের তরুণদের ক্ষেত্রেও এটি প্রাসঙ্গিক। আত্মপরিচয়ের সংকট মানুষকে একটি বৃহত্তর বৈশ্বিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত বলে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে।

বাংলাদেশের শহুরে তরুণদের ক্ষেত্রেও অনেক সময় বাঙালি পরিচয়ের চেয়ে বৃহত্তর বৈশ্বিক ইসলামের পরিচয়কে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। তাঁরা নিজেদের সেই বৈশ্বিক সম্প্রদায়ের একটি অংশ হিসেবে মনে করেন।

বৈশ্বিক ইসলামের সঙ্গে সংযোগ ও আধুনিক প্রযুক্তির সহজলভ্যতা তরুণদের ধর্মীয় বৈচিত্র্য জানার সুযোগ দিচ্ছে। আবার এর কারণে অনেক বাংলাদেশি তরুণ উগ্রবাদী মতাদর্শের ঝুঁকিতেও পড়তে পারেন।

সাদা-কালো পতাকামিছিল নিয়ে সরকারের অবস্থান কী

বিগত সময়ের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য অভিযুক্ত এক ব্যক্তি স্বীকার করেছিলেন, তিনি দীর্ঘদিন ধরে এই দ্বিধায় ভুগছিলেন যে, ‘তিনি আগে মুসলমান, নাকি আগে বাঙালি?’

পরবর্তী সময়ে তিনি নিজেকে সর্বাগ্রে একজন ‘প্রকৃত মুসলমান’ হিসেবে বিবেচনা করার সিদ্ধান্ত নেন এবং সেই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে তাঁর জীবনধারা উগ্রপন্থার দিকে পরিবর্তিত হয়।

বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের ওপর যে ‘নিপীড়ন’ চলছে, তার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার বিষয়টি বৈশ্বিক মুসলিম উম্মাহর একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়ার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মুসলমানদের দুর্ভোগ, সংঘাত ও নিপীড়নের সংবাদ অনেক তরুণের মধ্যে গভীর সহানুভূতিশীল মানসিক অবস্থার সৃষ্টি করে।

এমন অনেক শহুরে তরুণ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে নির্যাতিত মুসলমানদের প্রতি গভীর সহমর্মিতা অনুভব করেন এবং তাঁদের সঙ্গে একধরনের একাত্মতাবোধ গড়ে তোলেন।

বিচ্ছিন্নতার প্রভাবে ব্যক্তির মনোজগতের বদলের পেছনে তাদের মধ্যকার আত্মপরিচয়ের সংকটও ভূমিকা রাখতে পারে। আত্মপরিচয়ের সংকট অনেক সময় মানুষকে একটি বৈশ্বিক ও একরূপী বা হোমোজেনাস ইসলামের ধারণার দিকে আকৃষ্ট করে।

এই অনুভূতি যেমন এক বৈশ্বিক আত্মপরিচয় গড়ে তুলতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে, তেমনি উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো তাদের প্রকল্পে যুক্ত করতে এই অনুভূতিকে কাজে লাগায়। এর ফলে অনেকের কাছে মনে হতে থাকে, কেবল চিন্তাধারা ধারণ করাই যথেষ্ট নয়; বরং সেই চিন্তাকে উগ্রবাদী বাস্তব রূপ দেওয়া উচিত।

ফলে উগ্রবাদকে নিয়ন্ত্রণের জন্য উগ্রবাদে তরুণদের উৎসাহিত হওয়ার প্রক্রিয়াকে আমাদের পরিষ্কারভাবে বুঝতে হবে এবং তার সঠিক কারণগুলোকে আমলে নিতে হবে। সরকারের মধ্যে উগ্রবাদের উপস্থিতিকে অস্বীকার করার একটি প্রবণতাও দেখা যায়।

কিন্তু সমাজে উগ্রবাদের উপস্থিতিকে অস্বীকার না করে একে নিয়ন্ত্রণ ও মোকাবিলা করার প্রক্রিয়াকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক পরিসরে সেই ব্যবস্থার সমন্বয় করার পদক্ষেপ সরকারকেই নিতে হবে।

  • ড. বুলবুল সিদ্দিকী নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

  • মতামত লেখকের নিজস্ব

Read full story at source