জ্বালানি তেল থেকে ১০ বছরে সরকার পেয়েছে ১ লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকা
· Prothom Alo

আমদানি পর্যায়ে একক পণ্য হিসেবে সরকারের সবচেয়ে বেশি রাজস্ব আসে ডিজেল থেকে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) হিসাবে, গত অর্থবছরে শুধু ডিজেল আমদানিতেই বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সরকারকে ১১ হাজার ২২৮ কোটি টাকা শুল্ক-কর দিয়েছে।
ডিজেলসহ সব ধরনের জ্বালানি তেল মিলিয়ে অঙ্কটি আরও বড়। বিপিসির হিসাবে, ২০১৬-১৭ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত ১০ বছরে জ্বালানি তেল আমদানিতে শুল্ক-কর বাবদ সরকারকে প্রায় ১ লাখ ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা দিয়েছে সংস্থাটি।
Visit catcross.biz for more information.
এই বিপুল শুল্ক-কর দেওয়ার পরও দীর্ঘ সময় মুনাফায় ছিল বিপিসি। ২০১৪-১৫ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত নিরীক্ষিত হিসাবে মাত্র এক বছর লোকসান হয়েছে তাদের। সেই লোকসান বাদ দিয়ে বাকি ১০ বছরে সংস্থাটির নিট মুনাফা টিকেছে ৫৩ হাজার ১৩২ কোটি টাকা।
১০ বছরের শুল্ক-কর ও মুনাফার দুই অঙ্ক যোগ করলে পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ৭২ হাজার ৬৩২ কোটি টাকা। এই অর্থ এসেছে শেষ পর্যন্ত ভোক্তার কাছে জ্বালানি বিক্রির আয় থেকেই।
গত ১৮ এপ্রিল ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা করা হয়। গত রোববার তা আরও ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করা হয়েছে। একই সঙ্গে কেরোসিন ১৫৫, পেট্রল ১৬০ ও অকটেনের দাম ১৬৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন দাম ২১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হয়েছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার এবং অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বিশ্ববাজারে দাম কমলেও দেশে তেলের দাম সেভাবে না কমানো হয়নি। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরই বিশ্ববাজারে অস্থিরতা শুরু হয়। গত ১৮ এপ্রিল ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা করা হয়। গত রোববার তা আরও ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করা হয়েছে। একই সঙ্গে কেরোসিন ১৫৫, পেট্রল ১৬০ ও অকটেনের দাম ১৬৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন দাম ২১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হয়েছে।
এ বিষয়ে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেও মানুষের অসুবিধার কথা বিবেচনায় নিয়ে সরকার এত দিন দাম বাড়াতে চায়নি। কিন্তু বিপিসির আর্থিক সক্ষমতা কমে যাওয়া, নিয়মিত সরবরাহ ধরে রাখা এবং প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে দামের ব্যবধান থেকে পাচারের ঝুঁকি—সব মিলিয়ে শেষ পর্যন্ত দাম বাড়ানো হয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, তেলের ওপর সরকার কেন এত বেশি হারে শুল্ক-কর আরোপ করে রেখেছে।
মো. রফিকুল ইসলাম, বিপিসির চেয়ারম্যানবিপিসির কিছু অর্থ দুর্বল ব্যাংকে আটকে আছে, আর কিছু অর্থ বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য সংরক্ষিত। বর্তমানে জ্বালানি আমদানিতে ব্যবহারযোগ্য অর্থ প্রায় সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকা। ৪০টি ঋণপত্রের অর্থের ব্যবস্থা করতে গিয়ে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার ঘাটতি হতে পারে।লোকসান এক বছর
বিপিসির নিরীক্ষিত হিসাব অনুযায়ী, ২০১৪-১৫ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মধ্যে শুধু ২০২১-২২ অর্থবছরে সংস্থাটি ২ হাজার ৭০৫ কোটি টাকা লোকসান করেছে। অন্য বছরগুলোতে মুনাফা হয়েছে।
সদ্য বিদায়ী অর্থবছরেও লোকসান হয়েছে বলে জানিয়েছে বিপিসি, যদিও নিরীক্ষিত হিসাব এখনো প্রকাশিত হয়নি। সংস্থাটির প্রাথমিক হিসাবে, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চ মূল্যে তেল কিনে দেশে নিয়ন্ত্রিত দামে বিক্রি করায় প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকার ঘাটতি হয়েছে।
বিপিসি জানিয়েছে, আগের মুনাফার পুরো অর্থ তাদের হাতে নেই। ২০১৪-১৫ থেকে ২০২৪-২৫ পর্যন্ত মুনাফার প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্প ও পরিচালন ব্যয়েও অর্থ গেছে।
বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, গত ১ মার্চ সংস্থাটির হাতে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা ছিল। এরপর জ্বালানি আমদানির বিলসহ বিভিন্ন দায় পরিশোধ করতে হয়েছে। বিপিসির কিছু অর্থ দুর্বল ব্যাংকে আটকে আছে, আর কিছু অর্থ বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য সংরক্ষিত। বর্তমানে জ্বালানি আমদানিতে ব্যবহারযোগ্য অর্থ প্রায় সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকা। ৪০টি ঋণপত্রের অর্থের ব্যবস্থা করতে গিয়ে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার ঘাটতি হতে পারে।
বিপিসির মুনাফার প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকা গত এক দশকে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে। এখন আর্থিক চাপের মধ্যে সংস্থাটি উল্টো সরকারের কাছ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি পাওয়ার আশা করছে।
ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছাতে খরচ ১৭৭ টাকা
চলতি মাসে প্রায় ১৩ কোটি ১৩ লাখ লিটার ডিজেল খালাস করেছে বিপিসি। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস ও বাংলাবান্ধা স্থল কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, বন্দর পর্যন্ত প্রতি লিটার ডিজেলের গড় আমদানি ব্যয় ছিল ১২৬ টাকা ৪১ পয়সা।
এর ওপর লিটারে প্রায় ৩৩ টাকা শুল্ক-কর দেওয়ায় ব্যয় দাঁড়ায় ১৫৯ টাকা ৪১ পয়সা। বন্দর থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পরিচালন, পরিবহন, ডিলার কমিশন, উন্নয়ন তহবিলসহ আরও ১৭ টাকা ২৭ পয়সা খরচ হয়। সব মিলিয়ে প্রতি লিটারে ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১৭৬ টাকা ৬৮ পয়সা।
বর্তমান বিক্রয়মূল্য ১৩৫ টাকা ধরে এই চালানগুলোতে বিপিসির ঘাটতি লিটারে প্রায় ৪২ টাকা। তবে এর মধ্যে সরকারের শুল্ক-করই প্রায় ৩৩ টাকা। শুল্ক-কর বাদ দিলে আমদানি ও অন্যান্য ব্যয়ের তুলনায় ঘাটতি থাকে প্রায় ৯ টাকা।
তবে বিপিসির চেয়ারম্যান বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারদর, শুল্ক-কর ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে বর্তমানে প্রতি লিটার ডিজেলের ব্যয় প্রায় ২০৫ টাকা। দাম বাড়ানোর আগে তা বিক্রি করা হচ্ছিল ১১৫ টাকায়। অর্থাৎ তখন প্রতি লিটারে প্রায় ৯০ টাকা ঘাটতি হচ্ছিল। এর মানে, এখনো প্রতি লিটারে ঘাটতি ৭০ টাকা।
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম, সভাপতি, নলেজ হাব ইনস্টিটিউট ট্রাস্ট বিপিসির মুনাফার বড় অংশ সরকারি কোষাগারে নেওয়া হয়েছে। সংকটের সময়ে তার একটি অংশ ফেরত দিলে ভোক্তার ওপর চাপ কমানো যেত।এখন ভর্তুকি চায় বিপিসি
বিপিসির মুনাফার প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকা গত এক দশকে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে। এখন আর্থিক চাপের মধ্যে সংস্থাটি উল্টো সরকারের কাছ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি পাওয়ার আশা করছে।
বিপিসির চেয়ারম্যান জানান, জ্বালানির দাম বাড়ানোর ফলে প্রয়োজনীয় ভর্তুকির পরিমাণ কিছুটা কমবে। পাশাপাশি জ্বালানি বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থ নতুন আমদানির অর্থায়নে ব্যবহার করা হবে।
চাপ কমানোর সুযোগ কতটা
দাম না বাড়িয়ে শুল্ক-কর কমানোর সুযোগ ছিল কি না, এ প্রশ্নও উঠেছে। জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বলেন, এ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, সুযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিশ্চয়ই কর কমাত। তা না হওয়ায় ধরে নিতে হচ্ছে সেই সুযোগ ছিল না।
নলেজ হাব ইনস্টিটিউট ট্রাস্টের সভাপতি খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম প্রথম আলোকে বলেন, বিপিসির মুনাফার বড় অংশ সরকারি কোষাগারে নেওয়া হয়েছে। সংকটের সময়ে তার একটি অংশ ফেরত দিলে ভোক্তার ওপর চাপ কমানো যেত।
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, বিপিসিকে মূলত সেবাদানকারী সংস্থা হিসেবে ‘না লাভ, না ক্ষতি’ কাঠামোয় পরিচালনা করা উচিত। পাশাপাশি পরিচালন ব্যয়ে স্বচ্ছতা বাড়াতে আন্তর্জাতিক মানের স্বাধীন নিরীক্ষা প্রয়োজন। কারণ, জ্বালানির দাম বাড়লে তার প্রভাব শুধু পরিবহনে সীমাবদ্ধ থাকে না; উৎপাদন, কৃষি ও পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়িয়ে শেষ পর্যন্ত চাপ পড়ে ভোক্তার ওপর।