চাঁদের আলোয় গ্রামের আখড়ায় ওঁরাওদের রাইজ কারাম

· Prothom Alo

উপোস থাকা তিন কিশোরী সুচিতা কিসপটটা, সুনিতা তিগগ্যা ও পূজা টুডু রাস্তার ধারে অপেক্ষা করছে। সঙ্গে গ্রামের শিশু-কিশোরেরা। উপোস থাকা তিন ছেলে অন্য গ্রাম থেকে কারাম ডাল কেটে আনতে গেছে। গ্রামের নারী-পুরুষদের সঙ্গে নিয়ে কারাম ডালকে বরণ করে তারা গ্রামের আখড়ায় নিয়ে যাবে।

Visit forestarrow.help for more information.

গত শুক্রবার সন্ধ্যার আগে চাঁপাইনবাবগঞ্জের বরেন্দ্র অঞ্চলের গোমস্তাপুর উপজেলার পার্বতীপুর ইউনিয়নের শেরপুর গ্রামে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার ওঁরাওদের ‘রাইজ কারাম’ উৎসবে দেখা যায় এমন দৃশ্য।

সন্ধ্যায় ছেলেরা কারামের তিনটি ছোট ডাল কেটে নিয়ে আসার পর মাদল বাজিয়ে নেচেগেয়ে আখড়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান পুঁতে চারপাশে আলপনা আঁকা হয়। এরপর চলে পূজা-অর্চনা।

উপবাসী ছেলেদের কেটে আনা কারাম ডাল বরণ করছে উপবাসী মেয়েরা

ওঁরাওদের ভাষায় এ কারাম হচ্ছে ‘রাইজ কারাম’। আশ্বিন মাসে সাধারণত এ কারামের আয়োজন করা হয়। বৃষ্টিস্নাত শরৎকালে চাঁদের আলোয় গ্রামের আখড়ায় সন্ধ্যা থেকে রাতভর চলে কারাম উৎসব। ডালপূজার আনুষ্ঠানিকতা সেরে রাতভর নেচেগেয়ে মাতোয়ারা হয়ে কারামের আনন্দে ভাসে গ্রামের নারী-পুরুষ ও শিশুরা।

গ্রাম থেকে হারিয়ে যাওয়া কারামকে ফিরিয়ে আনার মূল কারিগর এ গ্রামের গৃহবধূ মিনতি বাকলা। যদিও মিনতি এখন আর গ্রামে থাকেন না। প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরের গ্রাম ঠেকাপাড়া থেকে শ্বশুরবাড়ি এসে এ কারামের আয়োজন করছেন তিন বছর থেকে।

মিনতি জানান, তিন বছর আগে যখন এ গ্রামে কারামের শুরু, তখন গ্রামের সব পরিবার এতে অংশ নেয়নি। পরের বছর সবাই অংশ নেয়। এবার শেরপুরের মানুষের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আশপাশের কোঠাডাঙ্গা, খারিপাড়া, জিনারপুর, দামকুড়া, হরিপুর, জিনারপুর, ধর্মপুর ও জামালপুরের মানুষ। কারাম গ্রামের মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি বন্ধন যেমন মজবুত করেছে, তেমনি অন্য গ্রামের মানুষের সঙ্গে এ গ্রামের মানুষের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।

কারাম ডাল ঘিরে আখড়ায় চলছে নাচগান

এ প্রসঙ্গে মিনতি বাকলা প্রথম আলোকে বলেন, ‘হামনিতো এইই চাহিলা। মানুষকের সাথ মানুষ মিলজুলকে রাহিবে। সবে মিলকে কারাম কারবে। হামার স্বপন পূরণ হোয়িলা। এ গাঁওকের কারাম আর নাহি থামিলা।’

রাজশাহী থেকে আসা ওঁরাওদের নেতা ও প্রাথমিকে সাদরি ভাষার পুস্তক প্রণয়নে এনসিটিবির সঙ্গে যুক্ত বঙ্গপাল সরদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রকৃতিপ্রেমী কৃষিজীবী ওঁরাওসহ সাদরিভাষী অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর মানুষেরা কৃষির, প্রকৃতির ও মানুষের মঙ্গল কামনা করে কারাম উৎসবের আয়োজন করে। কারামের ধর্মীয় সব আচার অনুষ্ঠান মিনতিরা ঠিকঠাকভাবে হয়তো করতে পারে না। অনেক ব্যতিক্রম দেখলাম। কারামে সাধারণত গ্রামের কুমারী মেয়েরা আগের দিন থেকে উপোস থেকে নানা আচার পালন করে। কিন্তু এখানে দেখলাম, তিনজন কিশোরীর সঙ্গে তিনজন কিশোর উপোস করেছে। এদের মধ্যে আবার দুজন সাঁওতাল সম্প্রদায়েরও রয়েছে। যে বাড়ি থেকে কারামের আয়োজন অর্থাৎ মিনতি বাকলার শ্বশুরবাড়িতে তাঁর (মিনতি) জায়েরাও উপোস করেছেন। কারামে এ রকম কিছু এর আগে দেখিনি। আমার কিন্তু ভালোই লাগছে। বলা যায় অন্তর্ভুক্তিমূলক চিন্তা আছে মিনতির কাজর। তাঁর চিন্তাকে ভক্তি জানাই।’

বঙ্গপাল সরদার জানান, সাধারণত তিন ধরনের কারাম উদ্‌যাপন হয়, ভাদ্রের পূর্ণিমায় আয়োজিত কারামকে ‘জিতিয়া কারাম’, আশ্বিন মাসের কারামকে ‘রাইজ কারাম’ ও দুর্গাপূজার দশমীতে আয়োজিত কারামকে ‘দাশাই কারাম’ বলে। তবে জিতিয়া কারামই বেশি উদ্‌যাপন হয়। ক্রমেই কারামের আয়োজন বাড়ছে। তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদরিভাষী শিক্ষার্থীরাও ক্যাম্পাসে কারাম উৎসব উদ্‌যাপন করছেন। তাঁরা শিকড়ের সন্ধান করছেন।

Read full story at source