তিন বছরে পোশাকশ্রমিকের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে তিন ভাগের এক ভাগ
· Prothom Alo

তিন বছর আগে তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি ৮ হাজার থেকে বেড়ে হয়েছিল সাড়ে ১২ হাজার টাকা। তখন এই টাকায় যে পরিমাণ পণ্য ও সেবা কেনা যেত, বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে একই পণ্য ও সেবা কিনতে অন্তত ২৯ শতাংশ অর্থ বেশি লাগছে। তার মানে, তিন বছরের ব্যবধানে তৈরি পোশাকশ্রমিকদের ক্রয়ক্ষমতা কমছে প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ।
Visit rouesnews.click for more information.
শ্রমবিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিম্নতম মজুরি নির্ধারণে চারজনের একটি শ্রমিক পরিবারের জীবনযাত্রার ব্যয় আমলে নিতে হবে। অতীতে কখনোই এটি বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। অতীতে সব সময়ই জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনের তুলনায় বেশ কম মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছে। সে জন্য মজুরি কিছুটা বাড়লেও শ্রমিকের জীবনযাপনের মান উন্নয়ন হয়নি। তবে মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে শিল্পের সক্ষমতাও বিবেচনায় নিতে হবে।
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকের নিম্নতম মজুরি ছিল ৬২৭ টাকা। ১৯৯৪ সালে সেই মজুরি ৪৮ শতাংশ বেড়ে ৯৩০ টাকা হয়। তারপর প্রায় ৩০ বছরে তৈরি পোশাক শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি বেড়েছে ১১ হাজার ৫৭০ টাকা। সর্বশেষ ২০২৩ সালে নিম্নতম মজুরি বেড়েছিল ৫৬ শতাংশ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ভোক্তা মূল্যসূচক (সিপিআই) অনুযায়ী, ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে চলতি বছরের গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মূল্য সূচকের মান বেড়েছে ২৮ দশমিক ৭ শতাংশ। তার মানে ২০২৩ সালের নভেম্বরে ১২ হাজার ৫০০ টাকা দিয়ে যে পরিমাণ পণ্য ও সেবা কেনা যেত, একই পরিমাণ পণ্য ও সেবা কিনতে এখন প্রয়োজন হবে ১৬ হাজার ৮৭ টাকা। শুধু তা-ই নয়, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে ডলারের হিসাবে শ্রমিকের মজুরি কমেছে সাড়ে ১১ ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০২৩ সালের নভেম্বরে প্রতি ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্যমান ছিল ১১০ দশমিক ৫ টাকা। তার বিপরীতে শ্রমিকের নিম্নতম মজুরি ছিল ১১৩ দশমিক ১২ ডলার। গত অক্টোবরে প্রতি ডলারের মূল্যমান দাঁড়িয়েছে ১২৩ দশমিক শূন্য ৩ টাকা। সেই হিসাবে শ্রমিকের মজুরি দাঁড়িয়েছে ১০১ দশমিক ৬ ডলার।
শ্রমিকেরা বাংলাদেশি মুদ্রায় মজুরি পেলেও মালিকেরা তৈরি পোশাক রপ্তানি আয় করেন ডলারে। টাকার অবমূল্যায়নের কারণে সেই ডলারের বিপরীতে বাড়তি অর্থ পাচ্ছেন মালিকেরা। ২০২৩ সালের নভেম্বরের তুলনায় গত অক্টোবরে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে ১১ শতাংশ। তার মানে, তিন বছর আগে ১০০ ডলারের পোশাক রপ্তানি করলে মালিকেরা পেতেন ১১ হাজার ৫০ টাকা। আর এখন পাচ্ছেন ১২ হাজার ৩০৩ টাকা।
গত মাসে প্রকাশিত বিবিএসের এক জরিপে উঠে এসেছে, সিটি করপোরেশন এলাকায় পরিবারের গড় মাসিক ব্যয় সবচেয়ে বেশি—৪৬ হাজার ৭৭৮ টাকা। আর শহরাঞ্চলে প্রতি পরিবারের মাসিক ব্যয় ৩৭ হাজার ৩৪৪ টাকা এবং গ্রামাঞ্চলে ৩২ হাজার ৫৩২ টাকা। জাতীয় পর্যায়ে পরিবারের মাসিক ব্যয়ের অর্ধেক খাবার এবং অর্ধেক খাদ্যবহির্ভূত খাতে ব্যয় হয়।
জানতে চাইলে গবেষণাপ্রতিষ্ঠান নলেজ হাব ইনস্টিটিউট ট্রাস্টের সভাপতি খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম প্রথম আলোকে বলেন, শুধু মূল্যস্ফীতি আমলে নিলে হবে না, শ্রমিকের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের বিষয়টিও দেখতে হবে। মজুরি নির্ধারণে মূল্যস্ফীতি ছাড়াও ১০টি বিষয় বিবেচনায় নিয়ে ত্রিপক্ষীয় সভায় নির্মোহভাবে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে অন্য খাতগুলোর মজুরিও বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ, নির্বাহী পরিচালক, বিলসএকটি পরিবার যেন স্বচ্ছন্দে চলতে পারে, সেভাবে মজুরি নির্ধারণ করতে হবে। পাশাপাশি সস্তা মজুরি তৈরি পোশাকশিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতার শক্তি—এমন ধারণা থেকেও বেরিয়ে আসতে হবে আমাদের।মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে গত মাস থেকে আন্দোলন করছেন তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকেরা। আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১ নভেম্বর সরকার নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করে। তারপরও শিল্পাঞ্চলে শ্রম পরিস্থিতি পুরোপুরি শান্ত হয়নি। এমন প্রেক্ষাপটে আজ সোমবার নিম্নতম মজুরি বোর্ডের দ্বিতীয় সভা অনুষ্ঠিত হবে। এতে শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি প্রাথমিক মজুরি প্রস্তাব জমা দেওয়ার কথা রয়েছে। মালিকপক্ষ এ সভায় মজুরি প্রস্তাব দেবে কি না, সেটি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘তিন বছর আগে পোশাকশ্রমিকদের যে মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছিল, সেটি গ্রহণযোগ্য মজুরি ছিল না। এবার সেটিকে ভিত্তি ধরে মজুরি নির্ধারণ করলে হবে না। মজুরি নির্ধারণের সরকারি কর্মকর্তাদের নতুন পে স্কেল ও বিবিএসের জরিপ আমলে নিতে হবে।’
সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ আরও বলেন, ‘শ্রমিকেরা অনেক বেশি মজুরি চান, তা কিন্তু নয়। শ্রমিকেরা বলছেন, বর্তমান মজুরিতে বাসা ভাড়া দিয়ে তাঁরা চলতে পারছেন না। সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ। ফলে একটি পরিবার যেন স্বচ্ছন্দে চলতে পারে, সেভাবে মজুরি নির্ধারণ করতে হবে। পাশাপাশি সস্তা মজুরি তৈরি পোশাকশিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতার শক্তি—এমন ধারণা থেকেও বেরিয়ে আসতে হবে আমাদের। তা না হলে অর্থনীতিতে গতি ফিরবে না।’