টরন্টোয় ‘দেওয়ান গাজীর কিস্সা’
· Prothom Alo

টরন্টোয় ‘দেওয়ান গাজীর কিস্সা’ মঞ্চস্থ হবে শোনার পর থেকে প্রথম আমার মাথায় চটজলদি এই চিন্তা ভর করে যে যদিও হয়তো গুটিকয় মানুষই আমরা ঢাকার নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের প্রযোজনাটি দেখেছি বহু আগে, সেটির তুমুল জনপ্রিয়তা দেখেছি, তাঁরা হতাশ হবে না তো! হতাশ হতে কার ভালো লাগে বলুন!
Visit salonsustainability.club for more information.
পাশাপাশি নাট্যজন মাহমুদুল ইসলাম সেলিমের প্রতি একধরনের ভরসাও ছিল! কারণ, গত বছরই তাঁর অভিনীত মঞ্চনাটক ‘রক্তকরবী’ দেখেই চমকে উঠেছিলাম! তখনই মনে হয়েছিল, এবার তবে টরন্টোর মঞ্চনাটকের গুণগত পরিবর্তনে বড়সড় বাঁক তৈরি হলো! ঢাকার মঞ্চের ‘রক্তকরবী’র স্মৃতি অম্লান অবস্থাতেই টরন্টোর ‘রক্তকরবী’ আমাকে বিস্মিত করে দিয়েছিল! সেদিন প্রথম বুঝেছিলাম, টরন্টো এখন বড় মাপের থিয়েটারের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত হয়েছে! লোকবলে এবং আর্থিক বলেও! খবর রাখিনি ‘রক্তকরবী’র আর কতগুলো শো কোথায় কোথায় হয়েছে, কিন্তু মনেপ্রাণে চেয়েছি, আরও অনেক শো যেন হয় নাটকটির!
টরন্টোর থিয়েটারে মাহমুদুল ইসলাম সেলিমের কাজ এই নিয়ে প্রথমবার দেখলাম, নির্দেশনা অর্থে বলছি। ‘দেওয়ান গাজীর কিস্সা’ আমার জন্য পজিটিভ অর্থে দ্বিতীয় শক!
গত রোববার নাটকটি শুরু হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যে আমার নজর কেড়ে নিলেন দেলোয়ার এলাহী, দেওয়ান গাজীর সাগরেদের ভূমিকায়! তিনি যে শক্ত পারফরমার হবেন, বিশ্বাস করেন প্রথম কয়েক মিনিটে সেটা তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন! অভিনেতার এন্ট্রি বলে একটা ব্যাপার থাকে, দেলোয়ার এলাহী জাস্ট তার উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে রইলেন! দর্শকদেরও হয়তো মাত্র কয়েক সেকেন্ড লাগল দেওয়ান গাজী ও মোক্তারের সম্পর্কের ধরনটা বুঝে নিতে! থিয়েটারের মুখ বলে একটা কথা আছে, অতি অল্প সময়ে এই দুজনের সম্পর্কের রসায়ন থেকে গোটা নাটকের গতি ও প্রবাহ কোন দিকে যেতে পারে, তার একটা সংক্ষিপ্ত আইডিয়া স্টাবলিশড হলো যেন! মঞ্চ প্রযোজনার জন্য নাটকের মুখটা এই জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ! বলাই বাহুল্য, স্ক্রিপ্টকে বাহবা দেওয়ার আছে, কিন্তু কথা হলো কী, আসলে স্ক্রিপ্টও নয়, ওই মুহূর্তটা যে দর্শক-শ্রোতার সামনে ওই নির্দিষ্ট সময়ে একটি ম্যাজিক তৈরি করে গেল, সেটাই ভালো প্রযোজনার অন্য রকম লক্ষণ!
কাহিনি হিসেবে, স্ক্রিপ্ট হিসেবেই ‘দেওয়ান গাজীর কিস্সা’ কমেডি ঘরানার। স্ক্রিপ্টের ভেতরকার মেসেজগুলো একটু খতিয়ে দেখলেই বোঝা যায়, এর ভেতরে উৎকৃষ্ট কমেডির মৌলিক কিছু গুণাবলি আছে! আমাদের সমাজের, ব্যক্তিজীবনের যাপিত বৈষম্য-বেদনাগুলোকে হাস্য-পরিহাসের ভেতর দিয়ে, একটু উল্টো করে দেখানোর প্রয়াস আছে। আমরা জানি, কমেডি থিয়েটার কত কঠিন! কারণ, কমেডি হলো ঘোষণা দিয়ে লোকহাসানোর মতন ব্যাপার। আর কে না জানে, যখনই ঘোষণা দেওয়া হয়, ততক্ষণে কমেডির বারোটা বেজে যায়! লোকে তখন আর হাসতে চায় না। এমনিতেই দেখে থাকবেন, মোটাদাগের হাস্যরসাত্মক কথাবার্তা খুবই বিরক্তিকর ধরনের হয়ে থাকে, প্যাচপেচে লাগে! হিউমার-হাস্যরসের কথা তাই বলতে হয় বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে, সিরিয়াসলি, চামে-চিকনে, গভীর আগ্রহের সঙ্গে, সিনসিয়ারিটির সঙ্গে!
নাটকের একটি দৃশ্যে হিমাদ্রী রয়, মাহমুদুল ইসলাম সেলিম ও দেলোয়ার এলাহীঢাকায় যেহেতু ‘দেওয়ান গাজীর কিস্সা’ দেখার সুযোগ হয়েছে, কাজেই মনে মনে তুলনা আসে অবশ্যম্ভাবী হয়ে! আলী যাকেরের সেই বিশাল বপু আর অভিনয় চোখে লেগে থাকার মতন। তারপরও বলতে হবে, সেই স্মৃতিকে টেক্কা দিয়ে মাহমুদুল ইসলাম সেলিম কী দাপটের সঙ্গে দেওয়ান গাজীকে মেলে দিলেন মঞ্চে! তিনি অভিজ্ঞ মঞ্চকর্মী, নিজেকে এবং মঞ্চকে ভালোভাবে জানেন, দর্শকের সন্তুষ্টি তিনি অর্জন করেছেন! দেওয়ান গাজীর দ্বৈত সত্তার মসৃণ ট্রানজিশনকে মুগ্ধ হয়ে দেখলাম টরন্টোয়!
নাটকের মাখন চরিত্রটি বাদবাকি চরিত্রগুলোকে একপ্রকার বুননের ভেতরে রেখেছে বলা যেতে পারে। দুই দিকে দুই শ্রেণিকাঠামোর দ্বন্দ্বের মাঝখানে থাকা চরিত্র মাখন একাধারে সরল ও চতুর! একাধারে খাপ খাওয়াতে আর বিদ্রোহ করতে প্রস্তুত! এই দুইয়ের আসা–যাওয়া উপস্থাপন নিতান্ত সহজ কাজ নয়! অভিনেতা হিমাদ্রী তাঁর আন্তরিক অভিনয় উপহার দিতে চেষ্টা করেছেন। তবু এ কথাও বলতে হবে, চরিত্রটির ডাইভারসিটি আরও শক্তিশালীভাবে অভিনীত হওয়ার দাবি রাখে!
বেশ ভালো করেছেন লাইলি চরিত্রের মানবী, তিনজন যৌনকর্মীর চরিত্রের অভিনেত্রী শাপলা-ডালিয়া-শর্মী! তাঁদের উজ্জ্বল উপস্থিতি এবং পরিশ্রমটা সার্থক। তাঁরা এত সাবলীলভাবে মঞ্চের দখল নিলেন, আমি তো থ! তবে কখনো কখনো মনে হয়েছে, তাঁরা তাড়াহুড়ো করছেন ডেলিভারি দিতে, আর একটু ইয়ে আছে, মানে আমি মঞ্চের একেবারে সামনের দিকেই বসে ছিলাম, প্রবল আগ্রহে সামনে ঝুঁকেও গেছি, তারপরও মনে হয়েছে, তাঁদের কণ্ঠস্বরের ব্যবহার ও শব্দের ক্ল্যারিটিতে বেশ একটু ইমপ্রুভমেন্টের জায়গা বোধ হয় রয়ে গেছে। থিয়েটারের প্র্যাকটিস হলো, কণ্ঠস্বরকে পেটের যত ভেতর থেকে বের করে আনা যায়, ততই ডেলিভারি শক্তিশালী হয়। এ ব্যাপারে সামনের সময়ে তাঁরা আরেকটু সিরিয়াস হবেন বলে আশা করছি!
সবিনয়ে বলি, যাঁরা অভিনয় করেছেন, তাঁরা অনেকেই, বলতে গেলে বেশির ভাগই প্রফেশনাল থিয়েটারকর্মী নন! এমনকি টরন্টোয় এ রকম বড় মাপের প্রযোজনার জন্য বছর ধরে নাট্যকর্মী তৈরি, তাঁদের জন্য নানা রকম ওয়ার্কশপ, টেকনিক্যাল হ্যান্ডস, গবেষণা, স্ক্রিপ্ট হ্যান্ডলিং, ফিজিক্যাল ফিটনেস, ভয়েস পরিচর্যা দুরূহ কাজ। আমার মাথায় খেলে না, কীভাবে পরিচালক নাটকের পুরো টিম সময় দিয়ে, অ্যাফোর্ড দিয়ে এ রকম একটা কাজ বের করে আনতে পারল!
দারোগা চরিত্রে শঙ্কু কী রকম মসৃণ আর তরতর করে এগিয়ে যাওয়া চরিত্র বলেন তো! প্রায় চোখের ফাঁক দিয়ে পিছলে পিছলে চলে আরকি! চেয়ারম্যান টিপু, কাজী প্রবাল, মজুর পলি, আশালতা, শিরিন—সবাই–ই তাঁদের স্বতঃস্ফূর্ততা দিয়ে সরব রেখেছেন পুরো সময়! তবে ওই কণ্ঠস্বরের ডেলিভারিটা আরকি!
নাটক শেষে কলাকুশলীদের সঙ্গে মঞ্চে আফরোজা বানু এবং লুৎফুন্নাহার লতাসূত্রধর সুমন সাইয়েদ ও তাঁর গানের দল আসর মাতিয়েছেন নিঃসন্দেহে! ও, আরেকটা কথা, পোশাক পরিকল্পনা নজর কেড়েছে! লাইট ও সেট ডিজাইন স্লিম ও যথার্থ! মনটা যদিও আরও একটু খুঁতখুঁত করছে, মনে হচ্ছে প্রায় সব এন্ট্রি-এক্সিট হরাইজন্টাল না হলেও পারত!
টরন্টো শহরের থিয়েটার এক নতুন মোড় নিয়েছে মাহমুদুল ইসলাম সেলিমের হাতে, যেন এত দিন তাঁর অপেক্ষাতেই ছিল এমন শাখা-পুষ্পে পল্লবিত হওয়ার! গত ২২ বছরে যেন চোখের সামনে দেখতে দেখতে টরন্টোর থিয়েটারের ছোট্ট চারা গাছটি আজ বৃক্ষে পরিণত হয়েছে!
এতক্ষণ শুধু ওপাড়ের বর্ণনাই করে গেলাম, এপাড়ে আমরা যারা দর্শক-শ্রোতা, তাদের পরিপক্বতার কথাও লিখতে হবে। মানে আমরাই সময়ের আবর্তে অনেক ম্যাচিওর হয়েছি। নাটক চলাকালে মঞ্চ এবং দর্শকের পারস্পরিক আদান-প্রদানে হলঘর কি জীবন্ত হয়ে ওঠেনি! ডায়ালগ ডেলিভারির মোড়ে মোড়ে দর্শক-শ্রোতার একাত্মতা আর রেসপন্স কি ম্যাজিক রিয়েলিটি তৈরি করেনি সেই দিন! করেছে। দর্শকেরা যেন নাটকের সঙ্গে, কাহিনির সঙ্গে, অভিনয়ের সঙ্গে এক হয়ে ছিলেন।
‘দেওয়ান গাজীর কিস্সা’ একটি হাস্যরসাত্মক মঞ্চ প্রযোজনা। মূল নাট্যকার বের্টোল্ট ব্রেশট তাঁর সময়ের সামাজিক বিভাজনকে ইঙ্গিতে-বক্তব্যে-হাসিতে প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছিলেন নাটকের প্রধান চরিত্র দেওয়ান গাজীর দুটি পরস্পরবিরোধী আচরণ পাশাপাশি প্রকাশের মধ্য দিয়ে! আজ থেকে প্রায় ৫০ বছর আগে থিয়েটার–উপযোগী এ নাটকের বাংলাকরণ ঘটেছিল আসাদুজ্জামান নূরের হাত ধরে। ঢাকার যে দুটি কমেডি নাটক তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে, তার একটি হলো এটি, আরেকটি ‘বিচ্ছু’! কল্পনায় দেখতে পাচ্ছি মাহমুদুল ইসলাম সেলিমের হাত ধরে ‘বিচ্ছু’ এগিয়ে আসছে!
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]