গণিত ভাইয়ার কাছে শিক্ষার্থীদের চিঠি
· Prothom Alo

১.
গণিত আমার খুব প্রিয় একটি বিষয়। বিভিন্ন বই ও ইন্টারনেটে গণিত সম্পর্কে পড়তে গিয়ে একটি বিষয় আমাকে বেশ ভাবিয়ে তুলেছে। আমরা জানি, গণিতের মাধ্যমে মহাবিশ্বের অনেক রহস্য ব্যাখ্যা করা যায়। গ্রহ-নক্ষত্রের গতি, আলোর বেগ, এমনকি একটি গাছের পাতার বিন্যাসেও গণিতের ছাপ পাওয়া যায়। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো—গণিত কি মানুষের আবিষ্কার, নাকি এটি মহাবিশ্বের শুরু থেকেই বিদ্যমান ছিল এবং মানুষ শুধু সেটিকে খুঁজে পেয়েছে? যদি গণিত মানুষের তৈরি হয়, তাহলে কেন মহাবিশ্বের প্রায় সব নিয়ম এত নিখুঁতভাবে গণিতের সূত্র মেনে চলে? আবার যদি গণিত আগে থেকেই প্রকৃতির মধ্যে লুকিয়ে থাকে, তাহলে পৃথিবীতে মানুষ আসার আগেও কি গণিতের সত্যগুলো একইভাবে বিদ্যমান ছিল?
Visit h-doctor.club for more information.
ইকরামুল হোসেন, ফরিদপুর জিলা স্কুল, ফরিদপুর।
∎ গণিত ভাইয়া: সত্যি বলতে, এর কোনো এককভাবে স্বীকৃত ও প্রমাণিত উত্তর নেই—এটি এখনো একটি খোলা দার্শনিক প্রশ্ন। তবে একটি সুন্দর মধ্যপন্থা হলো: প্রকৃতির নিয়ম ও প্যাটার্নগুলো আমরা আবিষ্কার করি, কিন্তু সেগুলো প্রকাশ করার ভাষা—প্রতীক, সংজ্ঞা ও লেখার পদ্ধতি—উদ্ভাবন করি।
যেমন: গ্রহের কক্ষপথকে উপবৃত্ত দিয়ে মডেল করা যায়—এই সম্পর্ক আমরা আবিষ্কার করেছি। কিন্তু ‘উপবৃত্ত’ শব্দটি, তার প্রতীক ও সমীকরণ লেখার পদ্ধতি আমাদের বানানো। গণিতবিদ ইউজিন উইগনারের একটি বিখ্যাত রচনা আছে—The Unreasonable Effectiveness of Mathematics in the Natural Sciences। সেখানে তিনিও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন, বিমূর্ত গণিত কীভাবে বাস্তব জগৎ ব্যাখ্যা করতে এত কার্যকর হয়। এটি প্রায় রহস্যময় একটি ব্যাপার।
তোমার মতো কেউ নবম শ্রেণিতেই এমন গভীর প্রশ্ন তুলেছে দেখে সত্যিই ভালো লাগল। এভাবেই প্রশ্ন করতে থাকো—গণিতবিদ হওয়ার আসল শুরুটা তো এখান থেকেই। গণিত ভাইয়ার শুভকামনা রইল তোমার জন্য।
২.
আমরা অসীম (∞) ধারণা ব্যবহার করি, অথচ বাস্তবে অসীমকে কখনো দেখতে পাই না। তাহলে গণিতে অসীমের ধারণা এত গুরুত্বপূর্ণ কেন? অসীম কি কেবল একটি কল্পনা, নাকি এর বাস্তব কোনো অস্তিত্ব আছে? এ ছাড়া শুনেছি, কিছু অসীম অন্য অসীমের চেয়ে বড় হতে পারে। যেমন: প্রাকৃতিক সংখ্যার অসীমতা এবং বাস্তব সংখ্যার অসীমতা নাকি সমান নয়। বিষয়টি কীভাবে সম্ভব? একটি অসীম আরেকটি অসীমের চেয়ে বড় হয় কীভাবে?
ইকরামুল হোসেন, ফরিদপুর জিলা স্কুল, ফরিদপুর।
∎ গণিত ভাইয়া: তুমি ঠিকই বলেছ, আমরা কখনো ‘অসীম’ জিনিসটি চোখে দেখি না—একটি অসীম দৈর্ঘ্যের কলম বা অসীম টাকার নোট কেউ কখনো দেখেনি। কিন্তু গণিতে অসীম খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ∞ কোনো সাধারণ বাস্তব সংখ্যা নয়; এটি সীমাহীনতা বোঝানোর একটি গাণিতিক ধারণা।
একটি সহজ উদাহরণ দিই। ধরো, তোমাকে জিজ্ঞাসা করা হলো—প্রাকৃতিক সংখ্যা ১, ২, ৩, ৪, ... কতগুলো আছে? তুমি বলবে, ‘শেষ নেই, চলতেই থাকে।’ এই ‘চলতেই থাকা’ ব্যাপারটি বোঝাতেই আমরা ∞ প্রতীকটি ব্যবহার করি। এটি কোনো নির্দিষ্ট বাস্তব সংখ্যা নয়; বরং বোঝায়, কোনো সীমা নেই, থামার জায়গা নেই।
ক্যালকুলাসে কোনো রাশি বা প্রক্রিয়া সীমাহীনভাবে এগোলে তার মান কোথায় পৌঁছায়, তা বোঝার জন্য সীমা বা limit ব্যবহার করা হয়। এর সাহায্যে বক্ররেখার নিচের ক্ষেত্রফল কিংবা কোনো বস্তুর তাৎক্ষণিক গতিবেগ বের করা যায়। তাই অসীমকে বাস্তবে দেখা না গেলেও এটি ছাড়া আধুনিক গণিত ও বিজ্ঞান কার্যত অচল হয়ে যেত।
একটি অসীম আরেকটি অসীমের চেয়ে বড় কীভাবে? এটি গণিতের ইতিহাসের সবচেয়ে চমকপ্রদ আবিষ্কারগুলোর একটি। জর্জ ক্যান্টর (Georg Cantor) উনিশ শতকে দেখিয়েছিলেন, সব অসীম সেটের আকার সমান নয়।
ক্যান্টর প্রমাণ করেছিলেন যে ০ থেকে ১-এর মধ্যকার সব বাস্তব সংখ্যাকে ১, ২, ৩, ... প্রাকৃতিক সংখ্যার সঙ্গে একে একে জোড়া বানানো সম্ভব নয়। তাঁর প্রমাণটি ‘ডায়াগোনাল আর্গুমেন্ট’ (Diagonal Argument) নামে পরিচিত।
সংক্ষেপে বলি। ধরো, কেউ দাবি করল যে সে ১, ২, ৩, ...-এর সঙ্গে ০ থেকে ১-এর মধ্যকার সব বাস্তব সংখ্যা জোড়া বানিয়ে একটি তালিকা তৈরি করেছে। ক্যান্টর সেই তালিকার প্রথম সংখ্যার প্রথম অঙ্ক, দ্বিতীয় সংখ্যার দ্বিতীয় অঙ্ক, তৃতীয় সংখ্যার তৃতীয় অঙ্ক—এভাবে কর্ণ বরাবর অঙ্কগুলো নিলেন। এরপর প্রতিটি অঙ্ক বদলে দিলেন—অঙ্কটি ১ হলে ২ এবং অন্য কিছু হলে ১ করলেন।
এভাবে তিনি একটি নতুন সংখ্যা তৈরি করলেন। নতুন সংখ্যাটি তালিকার প্রথম সংখ্যা থেকে প্রথম অঙ্কে, দ্বিতীয় সংখ্যা থেকে দ্বিতীয় অঙ্কে, তৃতীয় সংখ্যা থেকে তৃতীয় অঙ্কে—এভাবে তালিকার প্রতিটি সংখ্যা থেকে অন্তত একটি অঙ্কে আলাদা। তাই নতুন সংখ্যাটি তালিকার কোনো সংখ্যাই হতে পারে না।
অর্থাৎ তালিকাটি যত বড়ই হোক, অন্তত একটি বাস্তব সংখ্যা বাদ পড়বেই। তাই ০ থেকে ১-এর মধ্যকার বাস্তব সংখ্যাগুলোকে ১, ২, ৩, ...-এর সঙ্গে পুরোপুরি জোড়া বানানো যায় না। এই ‘না মেলা’ থেকেই বোঝা যায়, বাস্তব সংখ্যার অসীমতা প্রাকৃতিক সংখ্যার অসীমতার চেয়ে বড়।
৩.
গণিত নিয়ে আমার একটি প্রশ্ন অনেক দিন ধরে মনে ঘুরছে। প্রশ্নটি হলো—আমরা কি গণিত আবিষ্কার করেছি, নাকি গণিত আগে থেকেই মহাবিশ্বে ছিল এবং মানুষ শুধু সেটি খুঁজে পেয়েছে? যদি পৃথিবীতে কোনো মানুষ না থাকত, তাহলে কি π (পাই), মৌলিক সংখ্যা এবং পিথাগোরাসের উপপাদ্য তখনো সত্য থাকত? যদি সত্য থাকত, তবে কেন?
মো. শাহাদ, আব্দুলপুর মোশাররফ হোসেন উচ্চবিদ্যালয়, নাটোর।
∎ গণিত ভাইয়া: প্রিয় বন্ধু, এই প্রশ্নের সর্বসম্মত উত্তর নেই। সহজভাবে বলা যায়, গণিতের ভাষা ও প্রতীক মানুষ তৈরি করেছে, আর গাণিতিক সম্পর্ক ও প্যাটার্নগুলো আবিষ্কার করেছে। তাই গণিত কিছুটা উদ্ভাবিত, কিছুটা আবিষ্কৃত।
গণিত ভাইয়ার শুভকামনা তোমার জন্য।
গণিত ভাইয়া
∎ নতুন রূপে নতুন উদ্দীপনায় ফিরছে আমাদের প্রিয় গণিত ইশকুল। শিক্ষার্থীদের মধ্যে গণিতের আনন্দ ছড়িয়ে দিতে আপনার সব গাণিতিক চিন্তাভাবনা, লেখা বা সৃষ্টি পাঠিয়ে দিন আমাদের কাছে।
email: [email protected]
facebook: https://www.facebook.com/PA.GonitIshkul
*সহযোগিতায়: বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি