আহমদ ছফার ‘মরণ বিলাস’ কী নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে
· Prothom Alo

আহমদ ছফার মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক উপন্যাস ‘মরণ বিলাস’ নিয়ে পাঠচক্রের আসর করেছে ময়মনসিংহ বন্ধুসভা। সম্প্রতি প্রথম আলো ময়মনসিংহ অফিসে এই আসর বসে।
Visit fish-roadgame.online for more information.
স্বর্গ আর নরকের চিরন্তন সহাবস্থানে মানবজীবন, ‘মরণ বিলাস’-এর মুখ্য উপজীব্য। গ্রন্থটি প্রকাশিত হয় আশির দশকের ক্রান্তিলগ্নে। আহমদ ছফা তাঁর সূক্ষ্ম জীবনবোধ ও মানব দর্শন তুলে ধরেছেন এখানে। এটি এমন একটি উপন্যাস, যেখানে মানুষের জীবন ও মৃত্যুচিন্তার সঙ্গে সমাজ ও ক্ষমতার বাস্তবতা গভীরভাবে তুলে ধরা হয়েছে। মূলত ক্যানসারে আক্রান্ত মৃত্যুপথযাত্রী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফজলে ইলাহী এবং তাঁর সহযোগী স্বার্থান্বেষী ও সুযোগসন্ধানী পাতিনেতা মাওলা বক্সের কথোপকথনের মধ্য দিয়ে কাহিনির শুরু এবং সমাপ্তি ঘটেছে।
সবাই জানি, একদিন মৃত্যুবরণ করতে হবে। তারপরও মানুষ ক্ষমতা চায়, অর্থ চায়, প্রতিষ্ঠা চায়, অন্যের ওপর কর্তৃত্ব করতে চায়। কখনো কখনো চারপাশে এমন এক পৃথিবী তৈরি করে, যেখানে নিজের অস্তিত্বকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। ফজলে ইলাহী মূলত তাঁর জীবনের তিনটি বিশেষ ঘটনা বর্ণনা করেন মাওলা বক্সের কাছে। কাম, লালসা, ঘৃণা আর অবিবেচনার মোড়কে আবৃত এই ঘটনাগুলো যেন মানবজীবনের চিরন্তন কদর্যতারই প্রতীক।
জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে ফজলে ইলাহী চায় একজন শ্রোতা, যে কোনো বাধা না দিয়ে শুধু তার কৃতকর্মের ফিরিস্তি শুনে যাবে। দুঃসহ অনুতপ্তের ভারে, আর মৃত্যুর পরের অজানা জীবনের অনিশ্চয়তায় পড়েই হয়তো দিশাহারা হয়ে ওঠে মন্ত্রী। তার সৎভাইকে হিংসার বশে বিষ প্রয়োগ করে হত্যা করেছিল। তারপর একসময় সে রেঙ্গুনপ্রবাসী তার চাচাতো ভাইয়ের স্ত্রীর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল গভীর প্রণয়ে। আর তার সঙ্গে দীর্ঘকাল শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হওয়ার পর অন্তঃসত্ত্বা হয়ে লোকলজ্জায় আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছিল সেই নারী। এরপর স্কুলে পড়াকালীন অসৎ সঙ্গ পেয়ে জড়িয়ে পড়ে নানা অপকর্মে। ঘৃণার আগুনে জ্বালিয়েছে তার স্কুলের হিন্দু হেডমাস্টারের বসতবাড়ি; দগ্ধ করেছে তার সব সহায়সম্বল। এভাবেই রাজনীতির সঙ্গে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগিয়ে পরবর্তী সময়ে সাধু নেতা সাজে।
এসব পৈশাচিক ঘটনা ঘটানোর পরও নিজের প্রতি কোনো রকম অনুশোচনা অনুভব করেনি সে। আর তার কোনো অপকর্মের জন্য সে অনুতপ্ত নয়! বরং সে উল্টো অভিযোগ করে সামাজিক রীতিনীতিকে এবং সমাজ পারিপার্শ্বিকতাকে। সে যে শুধু খারাপ কাজ করেছে তা–ই নয়, তার জীবনে সে একটা মহৎ কাজও করেছে বলে দাবি করে; আর তা হলো—একজন কিশোরের জীবন ভিক্ষা দিয়েছে সে। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় একজন কিশোরকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছে। তার সেই মহৎ কাজ তাকে বারবার পাপবোধে গ্রাস হওয়া থেকে বাঁচাচ্ছে।
পাঠচক্র শেষে ময়মনসিংহ বন্ধুসভার বন্ধুরামাওলা বক্স প্রথমে তার প্রশংসা আর তোষামোদ করলেও পরবর্তী সময়ে ভাবান্তর ঘটে। মন্ত্রী সাহেবের অপকীর্তির বর্ণনা শুনে সে অসহ্য বোধ করে। ঘৃণাভরা স্বরে মাওলা বক্স বলল, মানুষ মানুষের কথা শুনতে পারে। ধৈর্য থাকলে পশুর কথাও শুনতে পারে। তবে মনুষ্য সন্তান যখন পশুর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় তখন তাকে সহ্য করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
মন্ত্রীর অপকর্মের কথা শুনে; মাওলা বক্স নিজের মধ্যে যুদ্ধ করছিল। ভাবছিল তার সঙ্গে কেন এসব হলো? কেন তাকেই এসব শুনতে হলো। সে ভাবতে পারছিল না মন্ত্রী মারা যাবার পর তার জীবনে কী হবে। তারপর শেষনিশ্বাসের আগে মন্ত্রী যখন তাকে বলল একটা আলো এসে গ্রাস করছে তাকে; আর ঠিক পরক্ষণেই নিথর হয়ে যায় মন্ত্রীর দেহ।
নিঃসন্দেহে ‘মরণ বিলাস’ আহমদ ছফার শ্রেষ্ঠতম কীর্তিগুলোর একটি। এটি পাঠককে জীবনের প্রকৃত মূল্য, সময়ের সীমাবদ্ধতা এবং বেঁচে থাকার প্রকৃত অর্থ নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে।
পাঠাগার ও পাঠচক্র সম্পাদক, ময়মনসিংহ বন্ধুসভা